মানুষ হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না প্রমাণ করেছেন আলপনা মন্ডল।
- বিজ্ঞাপন -

বস্ত্র ব্যাংক। এমন এক অভিনব উদ্যোগ, যা শুধুই দুঃস্থ মানুষকে জামাকাপড় দিয়ে সাহায্য করে তা নয়। কর্মহীন মানুষকে করে খাওয়ার সুযোগ ও করে দিয়েছে। আমাদের সকলের ঘরে ঘরে ব্যবহার যোগ্য ব্যবহৃত বস্ত্র আছে যা আমরা সময়ে সময়ে বাসন ওয়ালার কাছে বাসনের বিনিময়ে দিয়ে থাকি অথবা সমাজসেবী সংগঠনের মাধ্যমে দুঃস্থ মানুষের জন্য দান করে থাকি।

অনেক সময় সেগুলো দীর্ঘদিন পড়ে থাকার ফলে তা ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকেও না। তাই মানুষের হাতে তুলে দেবার পর মানুষ সেগুলো ফেলে দিতে বাধ্য থাকেন। আর সেই কথা মাথায় রেখেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার আলপনা মন্ডলের ভাবনা শুরু।


বস্ত্র ব্যাংক থেকে জামা কাপড় পেয়ে উজ্জ্বল খুশি মুখে বাচ্চারা। আমার গ্রামের মানুষদের কাছে বস্ত্র ব্যাংক সবসময় খোলা। যে কোন ব্যাক্তি এসে নিজের পছন্দসই জামা কাপড় বিনামূল্যে নিয়ে যেতে পারেন – আলপনা মন্ডল

- বিজ্ঞাপন -

কোভিড ১৯ এ হওয়া লক ডাউন কেড়ে নিয়েছে প্রচুর মানুষের কাজ। জীবন যাপন করা অনেকের পক্ষেই দুরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একক উদ্যমে ক্লাস ফোর অবধি পড়াশোনা করা আলপনা মন্ডল শুরু করেন এক অভিনব উদ্যোগ, যেখানে মানুষ শুধু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পাবেন তা নয়, বরং কিছু মানুষ পাবেন কাজ। ১৪ই জুলাই ২০২০ তে শুরু হওয়া এই বস্ত্র ব্যাংকের মাধ্যমে ওই গ্রামের গ্রামে ৩জন মহিলা একমাসে প্রায় ১৫দিন নিয়মিত কাজ দিতে পেরেছে। ওনারা সৃস্টি করতে পেরেছি ৪৫ টি শ্রমদিবস।

এই দফায় লকডাউনে কাজ হারিয়ে বসে থাকা তিনজন মহিলাকে আমরা তিন দিন করে কাজ দিতে পেরেছি, আপনাদের দেওয়া বস্ত্র এবং সাহায্য ৯টি শ্রম দিবস সৃষ্টি করল।

কলকাতায় বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে যা বস্ত্র সংগ্রহ করেছেন তার মধ্যে থেকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০টি বস্ত্র গরীব পরিবারের মানুষদের মধ্যে দান করা এবং হিউম্যান রাইটস কে ৭০টি বস্ত্র দেওয়ার পরে বর্তমানে ওনাদের ব্যাংকে গচ্ছিত আছে ৯০ টি শাড়ি,৫০ টি পাঞ্জাবি, ২০০ কুর্তি, ২৫০ টি শার্ট,২৫০টি হাফ এবং ফুল শার্ট, ১৫ টি সোয়েটার,৩০০টি বিভিন্ন সাইজের প্যান্ট, ১৫ টি ধুতি এবং ২০০ টি বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের জামা প্যান্ট। সাথে কিছু ওড়না। আর প্রায় ১০০ টি ব্লাউজ মিলিয়ে মোট ১৪০০ টি বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র।

আরো পরুনঃ  ভোটের দামামা আর কোভিড কে মাত করেই উদ্বোধন গড়িয়াহাট সঙ্গীত মেলা - আহারে বাহারে

আলপনা দেবীর বক্তব্য অনুসারে রাজ্যের যে কোন ব্যাক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওদের থেকে তালিকা অনুযায়ী বস্ত্র নিয়ে গরীব মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরন করবার জন্য নিতে পারেন। ওদের কাছে যা বস্ত্র আসে তার মধ্যে সবই যে পুনরায় ব্যবহার যোগ্য তা নয়। অনেক জামা কাপড় রঙ লাগা,ফাটা,চেন কাটা,পানের পিক লাগা অবস্থায় আসে। ওরা সেইগুলি বাছাই করে বাদ দেন। বাকি সমস্ত জামা কাপড় কেচে পরিস্কার করে মাড় দিয়ে ইস্তিরি করে প্যাকিং করে ওরা গরীব মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরনের জন্য তৈরী রাখেন।

অনেকেই এগিয়ে এসেছেন এই উদ্যোগে সামিল হতে। বস্ত্র দেবার সাথে সাথে দেন কিছু অর্থ সাহায্যও। আর সেই অনুদান দিয়ে সার্ফ সাবান কেনার খরচ বাদ দিয়ে এক এক জন দিদি এই একমাসে প্রত্যেকে ৩৬০০টাকা করে আয় করেছেন। গ্রামে, লকডাউনের সময়ে মহিলাদের হাতে টাকা আসার অর্থ তার সংসার চলে যাওয়া সেই দিক থেকে দেখতে গেলে আমরা কিছুটা হলেও সফল – দাবী আলপনা মন্ডলের।

তিনি এও বলেন যে “আজ থেকে ৪০ দিন আগে আমি যখন এই কাজ শুরু করি, তখন কিছু মানুষ কোমর বেঁধে বিরোধিতায় নেমেছিলেন। আদতে তারা আমার উপকার করেছিলেন, আমার জেদ এবং প্রতিজ্ঞার বারুদে দেশলাই ঠুকেছিলেন”।

সংসারে অভাবের তাড়নায় মাত্র ৯ বছর বয়সেই অন্যের বাড়ীতে কাজ করতে যাওয়া শুরু করতে হয়েছিল আলপনা কে। লুচি গোল না হওয়ার কারনে সাজা হিসেবে গরম তেলের ছ্যাঁকা উপহার পেয়েও হার মানেনি আলপনা।

১৩বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় আলপনার থেকে বয়সে ১৭ বছরের বড়, পেশায় ভ্যানচালক স্বামীর সাথে। আট হাতি শাড়ী পরে, এক মাথা চুল নিয়ে, হাতে গোবর জলের বালতি নিয়ে ভোর ৫টায় উঠোন নিকানো দিয়ে দিন শুরু হওয়া আর তারপর সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। বেলা তিনটেয় খাওয়া। একঘন্টা বিশ্রাম শেষ না হতে হতেই স্বামী ভ্যান রিকশা চালানো শেষ করে বাড়ি চলে আসত। নদীর খোলা হাওয়া, সাতজেলিয়ার জিলিপির দোকান। চুড়ির দোকান এইসবই ছিল আলপনার ভালো লাগার জগত। ৩০ বছর জীবন যুদ্ধের ভেলায় ভেসে বেড়ানো আলপনা মন্ডল আজ এক অন্য মুখ।

আরো পরুনঃ  আগস্ট ২০২০ তে ৩০ লাখ না এক কোটী? ভারতে সংক্রমণ কত হবে? কোভিড ১৯ এর ভারত যাত্রা!

এই যে অপুস্টিতে ভোগা বাচ্চা, মানসিক প্রতিবন্ধী, অসুস্থ অসহায় মানুষ আর বৃদ্ধা দের দুপুর বেলায় খেতে দেওয়ার প্রোজেক্ট চলছে হৈ হৈ করে তাতেও অনেকে স্বার্থ খোঁজে। আলপনার কি স্বার্থ? বস্ত্র ব্যাংক ছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং লাইনে ঘুটিয়ারি শরিফ স্টেশনের আগের স্টেশন থেকে হেঁটে প্রত্যন্ত গৌড়দহ গ্রামের দুঃস্থ বাচ্চাদের জন্য একবেলা করে খাবারের আয়োজন করছেন তিনি। একে একে এগিয়ে আসছেন বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে। বাংলার গর্ব, বাঙালির গর্ব এহেন মহিয়সী কে অল্ট বাংলার সেলাম।।

- বিজ্ঞাপন -