Gour_Bangla_Alt_Bangla
গৌড়ের বল্লালবাটি, মালদা
- বিজ্ঞাপন -

বাঙালির ইতিহাসে একটি বহুল প্রচলিত দাবি হল, আমাদের পুরো ভূখণ্ডের নাম বাঙ্গালা প্রথম মুসলমান সুলতানরাই চালু করেন, এবং এতদ্বারা ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির নির্মাতা তাঁরাই।

হ্যাঁ, পুরো ভূখণ্ডটির নাম বাঙ্গালা মুসলমান সুলতানদের আমলেই ঘটে, এই দাবিটি সর্বৈব সত্য বটে। কিন্তু তাতেই কি প্রমাণ হয় যে বাঙালি জাতির জন্ম আসলে মুসলমান সুলতানদের কীর্তি? আসুন, আমরা দুয়েকটি সূত্র অনুধাবন করব আজ।কেন গৌড় নামটা অপ্রচলিত হল?

একটা খুব চিত্তাকর্ষক তথ্য হল, আরবি-ফারসি ভাষায় গৌড় উচ্চারণ করা যেত না, কাছাকাছি যেটা বলা যেত সেটা হল গোর। মানে কবর। সুখময় মুখোপাধ্যায় অনুমান করেন এটি অন্যতম কারণ, গৌড়ের বদলে বাঙ্গালা নাম প্ৰচলিত হওয়ার পেছনে। আমি আর একটি অনুমান করি।

সেনযুগের শেষে গৌড় evacuated হয়, পরিত্যক্ত হয়। সমস্ত সম্পদ নিয়ে পূর্বে চলে যান ওঁরা। সুবর্ণগ্রাম বা সোনারগাঁও সেই সমৃদ্ধ স্মৃতির দ্যোতক। মনে রাখা দরকার মধ্যযুগে একাধিক বিদেশি পর্যটক পূর্বে বঙ্গাল বা বাঙ্গালা বলে একটি নগরীর অসীম সমৃদ্ধির কথা বলে গেছেন। বখতিয়ারের গৌড় দখলের প্রায় একশ বছর পরে হুগলি দখল হয়। আমি আগেও লিখেছি। মালদা থেকে হুগলি।

- বিজ্ঞাপন -

যে পথ দ্রুতগামী অশ্বে আট ঘন্টায় আসা যায় সেই পথ একশ বছরে অতিক্রম করেন ওঁরা। এবং বখতিয়ারের দেড়শ বছর পরে পূর্ববঙ্গ দখল হয়। যখন দখল হয়, তখন সেখানকার সমৃদ্ধি আর একটি কারণ যে পুরো প্রদেশটির নাম বঙ্গাল হয়। মুসলমান শাসনে বাঙ্গাল বা বাঙ্গালি কেবলমাত্র একটি ভৌগলিক/প্রশাসনিক ছাপ, এর সঙ্গে সংস্কৃতি ও জাতির সম্পর্ক নেই।

এই প্রসঙ্গে গৌড়ের রাজা গণেশের বিরুদ্ধে জৌনপুরের সুলতানকে চিঠি লিখে যুদ্ধযাত্রা করার আহ্বান যিনি জানান সেই শেখ নূর বাঙ্গালিকে মনে রাখা দরকার। নূর কুতুব উল আলম সমসাময়িক নথিতে এই নামেই পরিচিত ছিলেন, শেখ নূর বাঙ্গালি।

কি বলবেন, এই বাঙ্গালি আর বাঙালি জাতি এক? শেখ নূর এক বর্ণও বাংলা জানতেন তার কোনও প্রমাণ নেই। বলা দরকার, বঙ্গদেশের ক্ষেতে আল ছিল সেই থেকে বঙ্গাল আসেনি। সুনীতি চ্যাটার্জি বিষয়টা পয়েন্ট আউট করেন, যে আল একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ব্যবহৃত বহুবচন।

আরো পরুনঃ  যতদিন দেশের একটি কুকুরও অভুক্ত থাকবে, ততদিন আমার মুক্তি নেই - স্বামিজী

তামিল ভাষার ক্ষেত্রে এটাই -আর। দ্রাবিড়ার মুন্নেত্রা কাজাগাম। দ্রাবিড়ার মানে দ্রাবিড়গণ। এরকমভাবে আমাদের মধ্যে গঙ্গাল জাতি ছিল। গঙ্গাল অর্থাৎ গঙ্গা যুক্ত আল। গঙ্গাজন, গঙ্গাগণ। গঙ্গাল বা গঙ্গার থেকে গঙ্গারিড, গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায়, এর অর্থ গঙ্গার জাতীয়। সেখান থেকে আবার গ্রীক ভাষার বহুবচনে গঙ্গারিডাই, ল্যাটিন ভাষায় গঙ্গারিডি।বঙ্গ থেকে বঙ্গাল।

এই বঙ্গাল নামে প্রদেশের উল্লেখ পালযুগ থেকেই। রাগ বঙ্গাল আছে চর্যার। ভুসুকু বঙ্গালি হয়েছিলেন, যদিও এখানে সেটা সাধনমার্গ। কথা হচ্ছে জাতির নাম কিন্তু পাল্টায়। গঙ্গাল থেকে বঙ্গাল, নাম তো পাল্টে গেছে, ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।

এটাও মনে রাখা দরকার, আজকে যে জাতি ফরাসি বলে পরিচিত, তাদের আগে নাম ছিল গল। এবং মুসলমান শাসক এসে আমাদের জাতি ও ভাষার নাম পাল্টে দিলেন, অথবা তারা প্রথম বাঙ্গালা বললেন এই প্রদেশকে, বাঙ্গালি বললেন এই জাতিকে এবং আমরা সবাই এক জাতি হলাম, ব্যাপারটা কি এরকম? মুসলমান আসার ছয়শ বছর পরেও তো রামমোহন গৌড়ীয় ভাষার ব্যকরণ লিখেছেন।

কি বলবেন, তিনি বাঙালি নন? নাকি মুসলমান সুলতান আমলে সৃষ্টি আপনাদের এই বিশেষ বাঙালির মধ্যে চৈতন্যকে রাখা যাবে না কারণ তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন করেছিলেন?পালরা নিজেদের গৌড়েশ্বর ও বঙ্গপতি বলতেন, একই উপাধি সেনদের নিতে দেখা যায়।

গৌড়বঙ্গ মিলে একটিই মহাজাতি গড়ে উঠেছিল একমাত্র একটি তন্ত্রধর্মীয় মাতৃকা উপাসক ফেইথ সিস্টেমের মাধ্যমে। ইউভাল হারারির স্যাপিয়েন্স বইটা ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে, তিনি বলেন তাতে যে ধর্ম ব্যতীত কোনও বৃহৎ সম্প্রদায় তৈরি হয় না। কিন্তু তার অনেক আগে, ২০১০ সালেই আমি বলেছিলাম যে বাঙালির সংজ্ঞা সাংস্কৃতিক।

বাঙালির ধর্ম বাদ দিয়ে কোনও বাঙালি জাতি হয় না। এবং এই জাতি সুপ্রাচীন কালেই গড়ে উঠেছিল, মুসলমানরা আসার অনেক আগেই।আর একটি কথা বলি। আমরা যারা মান্য বাংলা ভাষায় কথা বলি, আমরা খুব সহজে মৈথিলি, উড়িয়া ও অসমিয়া ভাষা শুনে বুঝতে পারি। কেন? এই জায়গাগুলো প্রাচীন যুগে আমাদের সাম্রাজ্যের অংশ। শশাঙ্ক হোক বা পাল বা সেন।

আরো পরুনঃ  বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার? ডাঃ তমাল দাশগুপ্ত

আজ এগুলো আলাদা ভাষা হয়ে গেছে কারণ দুর্ভাগ্যক্রমে মধ্যযুগে মুসলমান শাসন শুরু হলে এই স্থানগুলো আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।মধ্যযুগে মুসলমান শাসকের অন্যতম কৃতিত্ব চট্টগ্রাম ও শ্রীহট্ট সুবে বাঙ্গালার অন্তর্ভুক্ত করা। এই দুটো জায়গার ভাষা আমরা আজও শুনে বুঝতে পারি না, কেন জানেন? কারণ শশাঙ্ক, পাল ও সেনযুগে এ দুটো প্রান্তিক অংশ স্বাধীন বা প্রায় স্বাধীন ছিল, ফলে এঁদের মধ্যে মান্য গৌড়ীয় ভাষা প্ৰচলিত হয়নি।

মুসলমান আমলে এ দুটো অংশ সুবে বাঙ্গালার অংশ হল বটে কিন্তু সে যুগে মান্য গৌড়ীয় ভাষার কোনও গল্প নেই।এখনও বলবেন, মুসলমান সুলতানের বদৌলতে বাঙালি জাতি সৃষ্টি? যারা নিজেরাই বাঙালি নন, তারা এসে আপনার জাতিকে তৈরি করে গেছে? এ কথা বলতে হয়ত আপনার ছাতি গর্বে ফুলে উঠছে, কিন্তু আপনাকে দেখে আমার যে লজ্জায় মাথা কাটা যায়!স্বাগত মধ্যযুগে।

আমি তমাল দাশগুপ্ত, দীর্ঘ এক দশক ধরে বাঙালির আদিযুগ নিয়ে পরম মমতায় কাজ করেছি এবং বাঙালির আদিযুগ সম্পর্কে জানিয়েছি। মধ্যযুগ নিয়েও এই সময়ে কিছু কাজ করেছি (মধ্যযুগের বাঙালি রাজাদের নিয়ে আমার কাজটি দ্রষ্টব্য, এছাড়া চৈতন্য বিষয়ক কাজ)। কিন্তু আমার একটানা ফোকাস আদিযুগের ওপরেই ছিল। মধ্যযুগ এক বধ্যভূমি, মধ্যযুগ এক হননকাল। তাকে নিয়ে কাজ করার নানা অসুবিধা।

দুর্বলচিত্ত ও সেকুলার ব্যক্তি মধ্যযুগের ইতিহাসকে গ্রহণ করতে পারেন না। অস্ট্রিচের মত আচরণ করেন। সবথেকে বড় অসুবিধা এই যে একটি নির্দিষ্ট হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল সুবিধা পেয়ে যায় বলে আকুল অভিযোগ আসে, কারণ বাদবাকি প্রত্যেক সেকুলার দল এই ইতিহাসকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে। এ সমস্ত অভিযোগকারীদের বলি, আমি আপনাদের প্রতি সমব্যথী, আমি আপনাদের যথেষ্ট হেড স্টার্ট দিয়েছি আমার ধারণা।

সত্যরে লও সহজে, এটুকুই বলব। বন্ধুরা হ্লাদিত হোন, শত্রুরা তটস্থ হোন, উদাসীনরা আড়চোখে দেখুন| আমার শুভেচ্ছা সবাইকে। আমি মধ্যযুগ নিয়ে লিখছি, শত্রুরা পারলে আমাকে থামান আর বন্ধুরা যা যা জানতে চান, লিখে জানান।

আরো পরুনঃ  দেউল - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-২

©তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

- বিজ্ঞাপন -