ব্ল্যাসফেমি না ইতিহাসের ক্ষত !!! ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় দম্পর্কে বিতর্কিত বিরুদ্ধ প্রচার গুলি

ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে থাকার সময়ে শিক্ষা বিল নিয়ে যেমন ভেবেছেন, তেমনই মেয়র থাকাকালীন কলকাতার জলনিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করেছেন।

0
561
ব্ল্যাসফেমি না ইতিহাসের ক্ষত !!! ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় দম্পর্কে বিতর্কিত বিরুদ্ধ  প্রচার গুলি
- বিজ্ঞাপন -

I will only do so if there is no party interference, I must be free to choose my ministers on the basis of merit and ability, rather than party membership.

“সময়টা ১৯৪৮ সাল। সদ্যখণ্ডিত পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিন্নমূল মানুষের ভিড়। খাদ্য ও বাসস্থানের অবস্থা ভয়াবহ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাঁচামাল পাটের যোগান বন্ধ। এই কর্মবীর তখন বহু পতিত জমি উদ্ধার করে এবং কিছু ধান জমিতে পাট চাষ করে লক্ষাধিক চটকল কর্মীর সম্ভাব্য বেকারী আটকান।
প্রতিষ্ঠা করেন ৫টি নতুন শহরের । দুর্গাপুর, বিধান নগর, কল্যাণী, অশোক নগর – কল্যাণগড় ও হাবরা ।
শিল্পসমৃদ্ধ বাংলা গড়তে, তার ত্রুটিহীন পরিকল্পনায় স্থাপিত হলো ‘দুর্গাপুর ইস্পাত নগরী’ । এ কাজে তাকে উচ্ছেদও করতে হয়নি এবং গুলিও চালাতে হয়নি।

- বিজ্ঞাপন -

স্থানাভাবের সমস্যা দূর করেছেন নতুন জায়গা খুঁজে এবং তৈরি করে। তৈরি করেছেন ‘চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা’। মানুষের বসবাসের জন্য তৈরি করেছেন কল্যাণী উপনগরী, লেকটাউন, সল্টলেক।
দুগ্ধ সরবরাহের জন্য ‘হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্প’ । বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য ‘কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা’।

বজবজে অথবা রাজ্যের কোনো উপযুক্ত স্থানে তৈল শোধনাগার গড়তে চেয়েছিলেন তিনি । আসাম এবং বিহারের রাজনীতিতে তা ভেস্তে যায়।
দার্জিলিংয়ে দেশের প্রথম পর্বতারোহণ শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন তিনি।
কলকাতার পর হলদিয়া বন্দর তার অনুপ্রেরণায় ।
ফারাক্কা ব্যারেজ মুলেও তিনি ।
সরকারী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী”কে সরকারী ভাবে প্রযোজনা করেন তিনি।

আরো পরুনঃ  চিরবিদায় জানালেন প্রণব মুখার্জী - একমাত্র বাঙালি (প্রাক্তন) রাষ্ট্রপতি

ভোর পাঁচটায় উঠতেন এই কিংবদন্তি। গীতা ও ব্রহ্মস্তোত্র পড়ে, স্নান সেরে, সাড়ে ৬টায় ব্রেকফাস্ট করে, দুঘন্টা বিনামূল্যে রোগী দেখে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আসতেন সবার আগে। সকাল ৯টা থেকে ১০টা জরুরি ফাইল। তারপর সচিবদের সাথে প্রশাসনিক আলোচনা। ১২.০০ থেকে ১.৩০ সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে কথাবার্তা।
অসাধারণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রশাসক, কিংবদন্তি চিকিৎসক এবং এক বিশাল কোমল কিন্তু সিংহ হৃদয়ের মালিক ছিলেন এই মহাজীবন ।

ব্ল্যাসফেমি না ইতিহাসের ক্ষত !!!

ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে মাঝে মাঝে মুখোমুখি হতে হয় কিছু অপ্রিয় তথ্যের । ইতিহাস অনেক সময় বিজয়ীর বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে । ঢাকা পড়ে যায় অনেক বিতর্কিত তথ্য । আবার অনেক ক্ষেত্রে দেবতুল্য ব্যক্তি বা বস্তুকে অসম্মানিত এবং কলঙ্কিত করবার সংগঠিত প্রচেষ্টা দেখা যায় । যার মূল উদ্দেশ্যই হলো ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো । এ ক্ষেত্রে সত্য, মিথ্যা বুঝে ওঠাটা দুস্কর হয়ে ওঠে ।

🔘 ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় দম্পর্কে বিতর্কিত বিরুদ্ধ প্রচার গুলি হলো :

** দিল্লির নির্দেশ আসে, গজানন খৈতান বলে এক মাড়োয়ারিকে অৰ্থমন্ত্রীত্ব এবং অন্য এক মাড়োয়ারিকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দেবার । বিরোধিতা করেন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ । দিল্লির অঙ্গুলিহেলনে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে সরিয়ে গদিতে বিধানচন্দ্র রায় । বিরোধীদের মতে , নেহেরু ভৃত্যের পুরস্কার।

আরো পরুনঃ  লিফটম্যান কে ঘুমাতে দেখে তাঁর গায়ে চাদর দিয়ে হাঁটতে চলে যান রাজ্যপাল।

** নেহেরুর নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গে আটকে দেন জন বিনিময়। পাঞ্জাবে জন বিনিময়ের ফলে ফিরেছে শান্তি । পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেল বিষাক্ত ক্ষতর চিরস্থায়ী সমস্যা ।

** উদ্বাস্তুদের সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেননি । পাঞ্জাবী এবং সিন্ধি উদ্বাস্তুদের জমি , বাড়ি , চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন দেওয়া হয়, দিল্লি , পাঞ্জাব , রাজস্থান ও গুজরাটে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের জোর করে , ভুল বুঝিয়ে পাঠানো হল…দণ্ডকারণ্যে , আন্দামানের প্রত্যন্ত দ্বীপে , উত্তরাখণ্ডের মানা , বিভিন্ন প্রত্যন্ত দ্বীপ এবং পাহাড়ি অঞ্চলে…শোচনীয় নরক যন্ত্রণায় ।
** বিরোধী মতে , ১৯৪৬ এর কলকাতা দাঙ্গার সব নথি পুড়িয়ে দেন তিনি।
** পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য বাঙালী অধ্যুষিত সিংভূম , মানভূম , দুমকা, ধানবাদ , রাজমহল , পূর্ণিয়ার মত জেলাগুলি বিহার সরকারকে দান করেন তিনি । আসামের কাছে হারান…ধুবড়ি , নওগাঁও , গোয়ালপাড়া ইত্যাদি।
** আসামের বাঙালি হত্যার কোনো প্রতিবাদ তিনি করেননি । বরং প্রতিবাদি রাম চট্টপাধ্যায়কে গ্রেফতার করেন তিনি।
** ফ্রেইট ইক্যুলাইজেশন পলিসির মতো বাঙালি বিরোধী আর্থিক নীতি আটকাতে ব্যর্থ হন তিনি ।
** কৃষক আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন দমনে নির্মম ভাবে লাঠি , গুলি চালান।
** দার্জিলিংয়ে গিয়ে নেপালি ভাষার স্বীকৃতি দেন এবং গোর্খা আবেগকে শক্তিশালী করেন । যার বিষময় ফল আজ আবার “বঙ্গভঙ্গে”র হুমকি।

সমালোচনা থাকতেই পারে । চাঁদও নিষ্কলঙ্ক নয় । কিন্তু সমালোচনাগুলি বাস্তবসম্মত, নাকি…শুধুমাত্র সম্মানীয় ব্যক্তির দিকে কাঁদা ছোড়াটাই লক্ষ্য!!! স্বল্প জ্ঞানে সে বিশ্লেষণে যাবো না । সে দায়িত্ব ছাড়া থাক রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষকদের উপর।

আরো পরুনঃ  "লিঙ্গ সাম্যে বিশ্বাসী বলেই আমি নারীবাদ বিরোধী"- ঐক্য বাংলার নেত্রী সুলগ্না দাশগুপ্ত

পরিশেষে বলা যায় ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে থাকার সময়ে শিক্ষা বিল নিয়ে যেমন ভেবেছেন, তেমনই মেয়র থাকাকালীন কলকাতার জলনিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করেছেন। বিধান রায় যদি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী না হতেন। কোনও সন্দেহ নেই বাংলার ইতিহাস অন্য রকম হতো । বিধানবাবু এক জন বহুমুখী সক্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। ভারী শিল্প এবং সমস্ত নতুন নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর, সবই তো ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর নিজের হাতে করা। সে দিন , সেই অস্থির সময়ে এ ভাবে পঙ্গু রাজ্যটাকে নিয়ে আর কেউ ভাবেনি । সে কারণেই তো তাকে বলা হয় “পশ্চিমবঙ্গের রূপকার”।

৫ টাকা২৫ পয়সা নিয়ে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন। তার তিরোধানের পর ঘরে পাওয়া যায় ১১ টাকা ২৫ পয়সা । কুঁড়েঘর থেকে রাজপ্রাসাদে রাজসিংহাসন পর্যন্ত কিংবদন্তি জীবনের সঞ্চয় মাত্র ৬ টাকা। ভারতের কোনো মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর এ রেকর্ড নেই ।


১ জুলাই তাঁর জন্মদিন, আবার মৃত্যুদিনও । এই দিনটি সারা ভারতে “চিকিৎসক দিবস” রূপে পালিত হয়।
এই কর্মবীরের জীবন দুকলম লিখে ধরা অসম্ভব । এ লেখা….এই মহাজীবনকে শ্রদ্ধা জানবার এক ক্ষুদ্র অক্ষম প্রচেষ্টা মাত্র।

🙏🙏🙏

লেখা : …✍️ ঐক্যযোদ্ধা অভিজিৎ গুহ নিয়োগী

- বিজ্ঞাপন -