১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল স্বদেশী ‘মার্গো’ সাবানের জয়যাত্রা , নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি : খগেন্দ্র চন্দ্র দাস – ঐক্য বাংলা

একেবারে খাঁটি দেশীয় জিনিস। দামও অতি সস্তা যাতে সবরকম অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষই ক্রয় করতে পারেন। তৈরি করলেন ল্যাভেণ্ডার পারফিউমও।

1
874
১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল স্বদেশী ‘মার্গো’ সাবানের জয়যাত্রা , নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি : খগেন্দ্র চন্দ্র দাস – ঐক্য বাংলা
- বিজ্ঞাপন -

মার্গো সাবান তো সকলেই ব্যবহার করেছেন! বা করেন। নিম টুথপেষ্ট? সেও তো বাঙালীর ঘরে ঘরে ব্যবহৃত। আর ল্যাভেন্ডার পারফিউম! সারা ভারত জুড়ে তার খ্যাতি। কিন্তু জানেন কি এই সব কটি জিনিসের উদ্ভাবনের পশ্চাতে আছে এক বাঙালীর বুদ্ধি, উদ্যোগ আর শ্রম। হ্যাঁ। তিনি কে.সি.দাস। না, নবীনচন্দ্র দাশের ছেলে নন; ইনি আর এক কে.সি.দাস; সম্পূর্ণ নাম খগেন্দ্র চন্দ্র দাস। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সারির অন্যতম উদ্যোগপতি ও ব্যবসায়ী।

আরো পড়ুনঃ বঙ্গসন্তান এয়ার মার্শাল ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন প্রথম যুদ্ধবিমান চালক

- বিজ্ঞাপন -

অষ্টাদশ শতকের একদম শেষ লগ্নে কলকাতার এক বৈদ্য পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। পিতা রায়বাহাদুর তারক চন্দ্র দাস ছিলেন পেশায় বিচারপতি। মা মোহিনী দেবী ছিলেন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’-র সভাপতি। মূলত মায়ের অনুপ্রেরণাতেই ছোটবেলা থেকেই খগেন্দ্রের মনে স্বদেশপ্রেম জাগ্রত হয়েছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি অতি সক্রিয় ভাবে ‘স্বদেশি’-র সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। তখন বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন দানা বাঁধছে ধীরে ধীরে। বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে বাঙালী তখন ব্রিটিশ শাসনের স্বরূপ বুঝতে শিখছে।

বাংলার মুখঃ “শ্রীলেদার্স” এর প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতা সংগ্রামী সুরেশ দে ছিলেন মাষ্টার দা সূর্য সেনের সহকর্মী

খগেন্দ্র তখন সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে শিবপুর কলেজে লেকচারারের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু গোপনে স্বদেশি গুপ্ত সমিতিগুলির সাথে যোগাযোগ রাখেন নিয়মিত। এমন সময়ে তারক দাসের এক ব্রিটিশ সহকর্মী বন্ধু তাঁর বাবাকে জানালেন, যে ওনার ছেলের ওপর পুলিশের নজর পড়েছে। ‘স্বদেশী’ করার অপরাধে খুব শিগগিরই খগেন্দ্র গ্রেফতার হবেন। কালাপানি হওয়াও আশ্চর্য নয়। ভীত তারকচন্দ্র দাস তখন ছেলেকে পুলিশি গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচাতে ছেলেকে চাপ দিতে লাগলেন লণ্ডনে গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য। বাধ্য হলেন খগেন্দ্র বাবার আদেশ মানতে তবে পুরোপুরি মাথা নত করলেন না।

১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল স্বদেশী ‘মার্গো’ সাবানের জয়যাত্রা , নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি : খগেন্দ্র চন্দ্র দাস – ঐক্য বাংলা
Khagendra Chandra Das, co-founder of Calcutta Chemical Company

দেশের শত্রু যারাঁ তাদের দেশে তিনি যাবেন না। তাই ১৯০৪ সালে ইণ্ডিয়ান সোসাইটি ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে স্কলারশিপ পেয়ে তিনি এবং আরো কয়েকজন বঙ্গসন্তান চড়লেন আমেরিকার জাহাজে। পাড়ি দিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিছুদিন পর ১৯০৭-এ অবশ্য তাঁকে আর সুরেন্দ্রমোহন বসু’কে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দে সেখান থেকেই দুজনে রসায়নে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করলেন। তাঁরাই প্রথম ভারতীয় যাঁরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন। তবে এরই মাঝে তাঁদের স্বদেশী কার্যকলাপ কিন্তু থেমে ছিল না। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েছিলেন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগের সাথে। লালা হরদয়ালের নেতৃত্বে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা সংগঠনের কাজও চালিয়ে গেছিলেন নিয়মিত।

আরো পরুনঃ  MSNBC finishes first in primetime basic cable for first time ever

এরপর দেশে ফেরার পালা। কিন্তু তাঁর আগে খগেন্দ্র আর সুরেন্দ্রমোহন থামলেন জাপানে। উদ্দেশ্য নিজেদের অন্তর্নিহিত ব্যবসায়িক ইচ্ছাগুলোকে বাস্তবায়িত করার জন্য হাতেকলমে শিক্ষাগ্রহণ। জাপানে থেকেই খগেন্দ্র শিখলেন ঔষধ এবং ওষধি উপাদান নির্মাণের কৃৎকৌশল। ফিরে এলেন দেশে। কিছু বছরের মধ্যেই ১৯১৬ সালে আর.এন.সেন এবং বি.এন.মৈত্র-কে পাশে নিয়ে তিলজলার পণ্ডিতিয়া রোডে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানী’। সংস্থাটি স্থাপিত হয়েছিল দেশীয় উপাদানে খাঁটি দেশীয় ঔষধ নির্মাণের উদ্দ্যশ্যে। স্বাদেশিকতার অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা সংস্থাটি কোনদিনই তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। কিন্তু এখানেই তো থেমে গেলে হবে না। তাহলে?

আরো পড়ুনঃ সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ রেড কাউ ডেয়ারি

তখন সারা বাংলা জুড়ে স্বদেশি আর বয়কটের জোয়ার। খগেন্দ্রও বুঝলেন শুধু বিদেশি পণ্য বয়কট করলেই হবে না, সঙ্গে চাই শুদ্ধ দেশি জিনিস। বেঙ্গল কেমিক্যালের কল্যাণে ওষুধ দুর্লভ নয়। খাদি বস্ত্র তৈরী হচ্ছে ঘরে ঘরে। তিনি নিজেও সেই যে বিলিতি পোশাক ছেড়ে খাদি পরা শুরু করেছিলেন, আমৃত্যু সেই অভ্যাস বজায় ছিল। বন্ধু সুরেন্দ্রমোহন দাস শুরু করলেন দেশি বর্ষাতি আর ছাতার ব্যবসা – ‘ডাকব্যাক’। তাহলে? অভাব রয়েছে দেশীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় সাবান শ্যাম্পুর। অতএব, যে বছরে ডাকব্যাক তৈরী হল, সেই একই বছর 1920 সালে খগেন্দ্র তৈরী করলেন ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানী-র ব্র্যান্ড-নামের অধীনে নিম টুথপেষ্ট এবং মার্গো সাবান।

একেবারে খাঁটি দেশীয় জিনিস। দামও অতি সস্তা যাতে সবরকম অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষই ক্রয় করতে পারেন। তৈরি করলেন ল্যাভেণ্ডার পারফিউমও। ক্রমশ চূড়ান্ত জনপ্রিয়তার কারণে ভারতের অন্যান্য সব বড় শহরেও প্রতিষ্ঠিত হল ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানী-র শাখা। ভারতের সর্বত্র এতই বিপুল চাহিদা বাড়ল মার্গো আর ল্যাভেণ্ডারের যে তামিলনাড়ুতে পৃথকভাবে নিমের বাগান তৈরী করতে হল। এরপর ভারতের সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল এর সুখ্যাতি। তার জেরেই সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত হল কোম্পানীর আর একটি শাখা।

আরো পরুনঃ  ভোটের দামামা আর কোভিড কে মাত করেই উদ্বোধন গড়িয়াহাট সঙ্গীত মেলা - আহারে বাহারে

সারা জীবন খগেন্দ্রচন্দ্র দাস বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশদের অনুগত চাকরি নয়, বরং স্বাধীন ব্যবসাই পারে বাঙালীর মেরুদণ্ডকে শক্ত করতে। শিক্ষিত যুবকদের উৎসাহিত করতেন ব্যবসা করার জন্য। বহু তরুণকে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন স্বাধীন ভাবে ব্যবসা শুরু করার জন্য। 1960 সালে যখন তাঁর মৃত্যু হয় তখন তাঁর স্নেহধন্য বরপুত্ররাই বহন করেছিলেন তাঁর শেষকৃত্যের সমস্ত ভার। বাঙালীর ব্যবসায়িক উদ্যোগকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় প্রসারিত করার বিরল কৃতিত্বের ভাগীদার বঙ্গজননীর এই রত্নসম পুত্র। আজও তাঁর তৈরী সাবান-টুথপেষ্ট-পারফিউম বাঙালী তথা ভারতের ঘরে ঘরে সমাদৃত।

আরো পড়ুনঃ যতদিন দেশের একটি কুকুরও অভুক্ত থাকবে, ততদিন আমার মুক্তি নেই

আজীবন স্বদেশী আদর্শে নিবেদিত এই মানুষটি হাতে বোমা-পিস্তল না ধরেও ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে এক অন্যতর বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। মার্গো সাবানের শতবর্ষ পূর্তিতে তাই আরও একবার ফিরে দেখা বাঙালীর সেই বিস্মৃত অধ্যায়কে- সশ্রদ্ধ বিনম্র প্রণাম সেই মানুষটিকে যিনি ছিলেন বাঙালীর এই গর্বিত ইতিহাসের অন্যতম কারিগর – খগেন্দ্র চন্দ্র দাস। “

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : শ্রেয়সী সেন

- বিজ্ঞাপন -

১ টি মন্তব্য