Saturday, June 19, 2021

বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার? ডাঃ তমাল দাশগুপ্ত

জব চার্নক নগর কলকাতার স্রষ্টা নন, কলকাতা হাইকোর্টের রায় আছে, এবং আমরাও নিশ্চিত জব চার্নক স্রষ্টা নন। কিন্তু সেক্ষেত্রে কলকাতার যদি কোনও স্রষ্টা থেকে থাকে, তবে ইতিহাসের সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাকদের নির্দ্বিধায় ও নিশ্চিন্তে কলকাতার নগর সভ্যতার স্রষ্টা বলা যায়।

অবশ্যই পরুনঃ

হ্যাঁ, ইতিহাসের যুক্তি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে বটে।

মুকুন্দরাম শেঠ সপ্তগ্রাম থেকে চলে আসেন কালীক্ষেত্রে (এই নামেই তখন পরিচিত ছিল), এবং এখানে এসে বন কেটে বসত করেছিলেন, সময়টা ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ (হরিপদ ভৌমিক)। ভক্ত বৈষ্ণব ছিলেন ওঁরা, এই শেঠ পরিবারের কুলদেবতা গোবিন্দজীউয়ের নামেই এই স্থানের নাম হয় গোবিন্দপুর (আরেকটি মত হল হাটখোলার দত্তবংশের আদিপুরুষ গোবিন্দশরণ দত্তর নামে এই গ্রামের নাম গোবিন্দপুর হয়। এই মত অগ্রাহ্য করে অতুল সুর বলেছেন, গোবিন্দশরণ এ অঞ্চলে অনেক পরে এসেছেন, তার আগে শেঠ বসাকদের আটপুরুষের বাস ঘটে গেছে এই অঞ্চলে)।

আরো পড়ুনঃ বিশ্বকবির অন্তিম সময় ও জনতা – অনিকেত চৌধুরী

মুকুন্দরামের পুত্র লালমোহন শেঠ বর্তমান লালদীঘি খনন করান, এবং খনন করে যে মাটি পাওয়া গিয়েছিল, সেই ইঁটে তিনি লালদীঘির পশ্চিমে নিজের ভদ্রাসন নির্মাণ করেন। এই ভদ্রাসন সংলগ্ন ১১০ বিঘার একটি সুন্দর উদ্যান ছিল, ইংরেজরা কলকাতায় আসার পরে এই অঞ্চলে সান্ধ্যভ্রমণ করত। তরুণ তরুণীরা এই উদ্যানে প্রেমও করতেন, অতুল সুর বলছেন, অতএব এটা সেযুগের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা নন্দন চত্ত্বর ছিল। লালমোহন এই অঞ্চলে একটা বাজারও স্থাপন করেন, সেটা লালবাজার নামে আজ খ্যাত (অতুল সুর)।

আরো পরুনঃ  মানুষ হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না প্রমাণ করেছেন আলপনা মন্ডল।

যারা এই অঞ্চলে সাবর্ণদের অধীনস্থ মজুমদার (হিসেবরক্ষক) ছিলেন, সেই মজুমদার পরিবারের শ্যামরায়কে নিয়ে দোলযাত্রা উৎসবের সময় একটা ঝামেলা ঘটে। অ্যান্টনি নামে একজন পর্টুগিজ নায়েব ছিল মজুমদারদের। কোম্পানির কয়েকজন কর্মচারী দোলযাত্রার মহোৎসব দেখবে বলে মজুমদারদের বাড়িতে ঢুকতে গেলে অ্যান্টনি বাধা দেয়, তখন চার্নক এসে অ্যান্টনিকে প্রহার করেছিলেন। সময়টা কলকাতার তথাকথিত স্থাপনার আগে, ১৬৮৮ সালে (এই সময় চার্নক কিছুদিন এসে থেকে গেছিলেন, এর আগে চার্নক নিয়ে লেখার সময় বলেছিলাম)। প্রসঙ্গত এই অ্যান্টনির উত্তরপুরুষ হলেন কবিয়াল অ্যান্টনি।

আরো পরুনঃ  ভারত রত্ন - স্বাধীনতা সংগ্রামী পুত্র - প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী প্রয়াত।
চিৎপুর অঞ্চল। গোবিন্দরাম মিত্রের মন্দির। ১৭৯৮ সাল, টমাস ড্যানিয়েলের আঁকা।

প্রথম প্রথম বরানগরের তাঁতিদের বাপ্তা নামে একরকম মোটা মসলিন কিনে সেটা পর্টুগিজ বণিকদের বিক্রি করতেন শেঠ বসাকরা। মুকুন্দরামের আগমনের অনেক বছর পর তাঁর উত্তরপুরুষ সাগরময় শেঠ গোবিন্দপুরে একটি তন্তুবয়ন কারখানা স্থাপন করেন, তাতে প্রচুর তাঁতি কাজ করত, অতুল সুর বলছেন। হরিপদ ভৌমিকের মতে, ১৬৩২ সালে শেঠ বসাকদের গোবিন্দপুরের তন্তুবয়ন কারখানায় আড়াই হাজার তাঁতি কর্মরত ছিল।

আরো পড়ুনঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু আবেগ নয়, বাঁচার লড়াই

সুতোর নুটি উৎপাদিত হত বলেই সুতানুটি। গোবিন্দপুরের এক ক্রোশ উত্তরে হাটখোলায় এই সুতোর নুটি কেনাবেচা হত। মধ্যযুগে বাংলা ছিল পৃথিবীর তাঁতঘর এবং এই সময় আজকের গার্ডেনরিচে পর্টুগিজ বাণিজ্য জাহাজগুলো নোঙর ফেলত। শেঠ বসাকদের বস্ত্রবয়ন শিল্প সেযুগে বাঙালির বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ছিল।

ইংরেজরা যখন গোবিন্দপুর অঞ্চলে গড় বানাতে শুরু করল, সেই সময় গোবিন্দপুর অঞ্চলটা খালি করানো হয়। এটাই আজকের কলকাতা ময়দান। এই সময়ে শেঠ বসাকরা ইংরেজদের সুদে ধার দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেন। ১৭০৪ সালে তারা মাত্র শতকরা এক টাকা সুদে ইংরেজদের ধার দিচ্ছেন দেখা যাচ্ছে।

আরো পড়ুনঃ মানুষ হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না প্রমাণ করেছেন আলপনা মন্ডল।

বাঙালির গোবিন্দপুর সুতানুটির সমৃদ্ধি একটা ছোট হিসেব থেকে বোঝা যাবে। ১৬৯৯-১৭০০ সালে ইংরেজ কোম্পানি মোট ১৯০২৭৫ পাউন্ড মূল্যের দ্রব্য রপ্তানি করে তাদের সুতানুটির কুঠি থেকে (যদিও এর মধ্যে গৌড়বঙ্গের অন্যত্র থেকে তাদের বাণিজ্যও ধরা আছে, তবে অনুমান করা যায় যে সুতানুটি-গোবিন্দপুরই প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল)।

আরো পরুনঃ  সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ "রেড কাউ ডেয়ারি'র প্রতিষ্ঠাতা - নারায়ণ মজুমদার - ঐক্য বাংলা
চিত্রশিল্পী অজানা।

পূর্ণেন্দু পত্রীর লেখায় মধ্যযুগের তন্তুবায়দের মধ্যে প্রচলিত একটি গ্রাম্য ছড়া পাচ্ছিঃ “চরকা মোর ভাতার পুত, চরকা মোর নাতি / চরকার দৌলতে আমার দুয়ারে বাঁধা হাতী”।

আরো পরুনঃ  আগস্ট ২০২০ তে ৩০ লাখ না এক কোটী? ভারতে সংক্রমণ কত হবে? কোভিড ১৯ এর ভারত যাত্রা!

এই তন্তুবাণিজ্য ছিল বাঙালির প্রধান আন্তর্জাতিক শিল্প, মধ্যযুগে। মূলত পর্টুগিজ ও আর্মেনিয়ানরা বাকি পৃথিবীর সঙ্গে বাঙালির পণ্যের সংযোগ রক্ষা করত। ইংরেজ অনেক পরে এই সমৃদ্ধির টানে সুতানুটিতে পা রাখবে। অ্যান্টনির ঘটনাতেও স্পষ্ট যে পর্টুগিজদের সঙ্গে ইংরেজদের একটা তিক্ত সংঘর্ষ ঘটেছিল প্রথম দিকে।

আমি এই লেখা শেষ করার আগে একটা অপ্রিয় সত্য কথা বলতে চাই। আদি কলকাতায় বাঙালির উচ্চবর্গ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ বৈদ্য কায়স্থ প্রায় নেই, থাকলেও সংখ্যায় খুবই কম। এরা যথেষ্ট সংখ্যায় এসেছিলেন বেশ খানিকটা পরে, মূলত ইংরেজের মুৎসুদ্দি হয়ে বা চাকরি করতে। আদি কলকাতা যাঁদের তৈরি, সেই সবকটি বাঙালি বর্গই কলকাতার ইতিহাস রচনার সময় খানিকটা প্রান্তিক হয়ে গেছেন, কারণ ইংরেজ আমলেই মূলত বাঙালির ত্রিজাতি (মুসলমান আমলেও এই ত্রিজাতিই বিশ্বমানব এবং মুসলমানের চাকুরে ছিল)-র কলকাতায় আগমন।

আরো পড়ুনঃ সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ “রেড কাউ ডেয়ারি’র প্রতিষ্ঠাতা – নারায়ণ মজুমদার

ফলে একটা আশ্চর্য ব্যাপার হয়েছে। কলকাতার একটা বিশ্বমানবিক ইতিহাস লেখা হয়েছে, সেখানে জব চার্নক কলকাতার স্রষ্টা। নিঃসন্দেহে কলকাতার বৃদ্ধি ঘটেছে ইংরেজের রাজধানী হওয়ায়। কিন্তু আমরা শুরুর কথা বলছি। ইংরেজ যে সুতানুটি গোবিন্দপুর কলকাতার সমৃদ্ধিতে আকৃষ্ট হয়ে এসেছিল, সে সমৃদ্ধ বাণিজ্যপীঠ মূলত বাঙালি বণিকদের তৈরি, যদিও আরও অনেকে ছিলেন (আদি কলকাতার কাস্টগুলো নিয়ে আরেকদিন লিখব)।

আরো পরুনঃ  পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

না, সাবর্ণরা স্রষ্টা নন। কারণ ওঁরা যশোরসম্রাট প্রতাপাদিত্যের সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশ মানসিংহের কাছ থেকে পেয়েছিলেন (তিন মজুমদারে বাংলা ভাগঃ নদীয়া রাজবংশের ভবানন্দ, সাবর্ণ রাজবংশের লক্ষ্মীকান্ত আর গঙ্গার পশ্চিমে প্রতাপের সাম্রাজ্যভাগ পেয়েছিলেন সপ্তগ্রামের রাজবংশ জয়ানন্দ), সেটা কোনওমতেই ১৫৯৮ সালের আগে নয়। বাদশাহী সনদ আরও কয়েক বছর পরের হবে, স্মৃতি থেকে বলছি। অতএব সাবর্ণবংশ এখানকার অধিকার পাওয়ার আগে, এমনকি যশোরসম্রাট প্রতাপের রাজত্বের উত্থানেরও আগে থেকে বাণিজ্যপীঠ কলকাতা আছে সগৌরবে।

Image may contain: one or more people, sky, crowd, cloud and outdoor
চার্লস ডয়লি, ১৮৪৮। কলকাতার চড়ক পুজো।

মুকুন্দরাম শেঠ যখন সপ্তগ্রাম ত্যাগ করে এই কালীক্ষেত্রে পদার্পণ করেন, এবং শাক্তমাতৃকার নামাঙ্কিত এই পুণ্যভূমিতে বৈষ্ণবদেবতা গোবিন্দজীউয়ের নামে এই গোবিন্দপুরের স্থাপনা হয়, সেদিন বাঙালির একটি অপূর্ব সংশ্লেষের ধারায়, বাণিজ্যনগরী সপ্তগ্রামের উত্তরসূরী হিসেবে এই নগর কলকাতার শুরু, এই দাবি করে আমি লেখাটি শেষ করলাম। কেউ যদি এই দাবি খণ্ডন না করতে পারেন, যদি এই বাণিজ্যনগরের উত্থানের উৎসবিন্দু হওয়ার অন্য কোনও দাবিদার না থেকে থাকে, তবে অনুগ্রহ করে এটি মান্য করুন।

আরো পরুনঃ  নজরুল স্মরণে - নজরুল জয়ন্তীর শ্রদ্ধার্ঘ্য - দেবাশীষ মুখার্জী

জব চার্নক নগর কলকাতার স্রষ্টা নন, কলকাতা হাইকোর্টের রায় আছে, এবং আমরাও নিশ্চিত জব চার্নক স্রষ্টা নন। কিন্তু সেক্ষেত্রে কলকাতার যদি কোনও স্রষ্টা থেকে থাকে, তবে ইতিহাসের সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাকদের নির্দ্বিধায় ও নিশ্চিন্তে কলকাতার নগর সভ্যতার স্রষ্টা বলা যায়।

© তমাল দাশগুপ্ত

- Advertisement -

আরো প্রতিবেদন

একটি মতামত জানান

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisement -

সদ্য প্রকাশিতঃ