Sunday, June 13, 2021

বঙ্গসন্তান এয়ার মার্শাল ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন প্রথম যুদ্ধবিমান চালক – ঐক্য বাংলা

দক্ষিণ কলকাতার ইন্দিরা সিনেমাহলের কাছে একটি রাস্তার নাম 'ইন্দ্র রায় সরণী'। কিন্তু আমরা কজনই বা চিনি এই বীর বাঙালিকে। বাঙালির ভীতু , ঘরকুনো তকমাটা যিনি মুছতে চেয়েছিলেন , মৃত্যুর একশো বছর পরেও সেই ল্যাডি ওরফে ইন্দ্রলাল রায়ের নামে একটা রাস্তার নামকরণ ছাড়া আমরা আর কোনো সম্মানই দেখাইনি। "

অবশ্যই পরুনঃ

দক্ষিণ কলকাতার দিকে যাতায়াত আছে ? কোনোদিন কি চোখে পড়েছে ভবানীপুরে রাস্তার “ইন্দ্র রায় সরণী ” লেখা সাইনবোর্ডটা ? কৌতূহল জাগেনি মনে কে এই রায় ?
আম বাঙালির কাছে অচেনা এই বঙ্গসন্তানের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায়। বাবা সেই আমলের নামী ব্যারিস্টার এবং কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউশনস – এর ডিরেক্টর প্যারীলাল রায় ও মা ললিতা রায় । মাতামহ সূর্য ( গুভিড ) চক্রবর্তী ছিলেন দেশের প্রথম অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার ।

বাংলার নারীঃ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধ ব্যবসা, ফ্ল্যাটের কমন স্পেস আটকানোর প্রতিবাদে মহিলাকে কটুক্তি।

বরিশালের ধনী পরিবারের ছেলে প্যারীলাল বিশ্বাস করতেন , একমাত্র ব্রিটিশরাই পারে ভারতীয়দের গড়ে তুলতে । ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস । আর এজন্যই ১৯০১ সালে ছয় সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চলে এলেন লন্ডনে। বাড়ি নিলেন হ্যামারস্মিথে , ৭৭ নম্বর ব্রুক গ্ৰিনে। পরেশ , ল্যাডি ও
ললিত – তিন ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন হ্যামারস্মিথে সেন্ট পল বয়েজ স্কুলে । আর লীলাবতী , মীরাবতী এবং হীরাবতী – তিন মেয়ে ভর্তি হল সেন্ট পল স্কুল অব গার্লসে । কিন্তু প্যারী লন্ডনে থাকলেন না। সংসার গুছিয়ে দিয়ে স্ত্রী ললিতার দায়িত্বে সন্তানদের রেখে ফিরে আসেন কলকাতায়।

আরো পরুনঃ  স্বাধীনতা সংগ্রামী "সুরেশ দে" প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শ্রীলেদার্স" - ঐক্য বাংলা

সমাজসেবা , পড়াশোনা , খেলাধুলা , সঙ্গীত – সব কিছু নিয়ে লন্ডনের দিনগুলো হইহই করে কাটছিল ললিতা ও তাঁর ছেলেমেয়েদের। সুখী জীবনে ছেদ পড়ল ১৯১৪ সালে , শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ । পরেশ তখন কেমব্রিজের ইমানুয়েল কলেজ থেকে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে । কিন্তু হঠাৎ সেনাবাহিনীতে কেন ? এই প্রশ্নের উত্তরে বহু দিন পরে বলেছিলেন , ” আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম , বাঙালিরাও রণাঙ্গনে গিয়ে অন্য দেশের সৈনিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে।”

আরো পরুনঃ  সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ "রেড কাউ ডেয়ারি'র প্রতিষ্ঠাতা - নারায়ণ মজুমদার - ঐক্য বাংলা

সেই সময় ল্যাডির বয়স মাত্র পনেরো। দাদাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঠিক করেন , পড়াশোনার গন্ডি পেরিয়ে তিনিও সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। তবে স্থলবাহিনীতে নয় , উড়তে চেয়েছিলেন আকাশে। স্কুলের পাঠ শেষ হলে অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন কিন্তু উঠে পড়ে লাগলেন স্বপ্নপূরণের আশায়। ‘ রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পস’ এ যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করলেও কপাল খারাপ! দুর্বল দৃষ্টিশক্তির জন্য পরীক্ষায় উতরোতে পারলেন না। ভেঙে না পড়ে বিক্রি করে দিলেন তাঁর শখের মোটরসাইকেল। সেই টাকা দিয়ে ব্রিটেনের সবচেয়ে নামী চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করালেন। চিকিৎসক সবুজ সংকেত দিতেই ফের একবার রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পস এ আবেদন করেন। এ বার সসম্মানে পাশ করলেন। মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে গেলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তখন জ্বলছে সমগ্র ইউরোপ। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গিয়েছে দিদি লীলার। দুই ছেলে যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর ললিতা বাকি তিন সন্তানকে নিয়ে বাড়ি বদলে চলে আসেন কেনসিংটনে কুইন অ্যান্ড মেনশনে।

জুলাই ১৯১৭। অক্সফোর্ডে ট্রেনিং শেষে উনিশ বছর বয়সী ল্যাডি ৫৬ নম্বর স্কোয়াড্রনে সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের পদে যোগ দেন। ফ্রান্সের ভাদোম-এ পোস্টিং হয় তাঁর। কথাবার্তায় চৌখস এই বঙ্গসন্তান অচিরেই এয়ার ফোর্সে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। আকাশে উড়তে না উড়তেই মুখোমুখি হন শত্রুপক্ষ জার্মান বিমানের.. ছয়মাসের মধ্যে ঘটে গেল এক অঘটন। সেই দিন এস ই ফাইভ বিমানে আকাশে উড়ছিলেন, আচমকা তাঁর বিমানকে লক্ষ্য করে এক জার্মান যুদ্ধবিমান গুলি চালায়। নো ম্যানস ল্যান্ড এ ভেঙে পড়ে বিমান। স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় তাঁকে। দেহ রাখা হয় মর্গে। হঠাৎ মর্গের দরজায় ভিতর থেকে ধাক্কা। ভূতের ভয়ে হাসপাতালের কর্মীদের তো একেবারে দাঁতকপাটি লেগে যাওয়ার জোগাড়।

আরো পরুনঃ  মহাষষ্ঠী ও মহাসপ্তমীর দিনে পড়ল UGC NET পরীক্ষা - প্রতিবাদে সরব ঐক্য বাংলা
আরো পরুনঃ  নজরুল স্মরণে - নজরুল জয়ন্তীর শ্রদ্ধার্ঘ্য - দেবাশীষ মুখার্জী

বাংলার মুখঃ সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ “রেড কাউ ডেয়ারি’র প্রতিষ্ঠাতা – নারায়ণ মজুমদার

ভূত নয় আসলে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল ল্যাডি। দুর্ঘটনায় সে দিন তিনি মারা যাননি। মর্গে জ্ঞান ফিরে আসায় দরজায় ধাক্কা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছিলেন। হাসপাতালের কর্মীদের ভূতের ভয় তাড়িয়ে শেষমেষ বোঝাতে সমর্থ হন যে তিনি বেঁচে আছেন। নিজের শিবিরেও ‌ ফিরে আসেন তিনি। চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে ল্যাডি। তবে সুস্থ হয়ে উঠলেও আর বিমান চালানের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর বারংবার অনুরোধ ও অদম্য ইচ্ছের কাছে হার মানতে হয় ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে। আকাশে ওড়ার জন্য আবার শারীরিক প্রস্তুতি নেন তিনি। হাসপাতালে থাকার সময় তিনি মানসিক দিক থেকেও আরও পরিণত হয়েছিলেন। বৈমানিকের দক্ষতায় আরো শান দিয়ে ১৯১৮ সালের ২২ জুন যোগ দেন ৪০ নম্বর স্কোয়াড্রনে।

জুলাই ১৯১৮। আবার বিমান নিয়ে উড়ে ‌ যান যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রথম দিনেই তাঁর আক্রমণে পরাজিত হয় এক জার্মান বিমান। ৯ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই টানা দশ দিনে ন’টি জার্মান বিমানকে তিনি আক্রমণ করে মাটিতে নামিয়ে আনেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় বিমান চালক যিনি ১৭০ ঘন্টা যুদ্ধ বিমান চালানোর রেকর্ড করেছিলেন।

২২ জুলাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার চার মাস আগের ঘটনা। ফ্রান্সের আকাশে উড়ছেন , তাঁর মন হিসেব কষছে শত্রুপক্ষের বিমানকে ধূলিস্যাৎ করার। আর ঠিক তখনই চার-চারটি জার্মান ফকার যুদ্ধবিমান তাঁকে চার দিক থেকে ঘিরে ধরে । ধুন্ধুমার যুদ্ধ শুরু হয় আকাশে। চার বনাম একের যুদ্ধে অভিমন্যুর মত সর্বশক্তি দিয়ে লড়েন ল্যাডি , পরাস্ত করেন দুটো জার্মান বিমানকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না ‌। একটি জার্মান বিমানের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা খায় তাঁর বিমান। শেষ হয়ে যায় তাঁর আকাশে ওড়ার স্বপ্ন !
লন্ডনে বসে ললিতা জানতে পারেন , তাঁর মেজো ছেলে ‘মিসিং ইন একশন’।

আরো পরুনঃ  বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার? ডাঃ তমাল দাশগুপ্ত

১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি যে বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন , তা নিশ্চিত করে রয়্যাল এয়ার ফোর্স। ওই বছরই রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পসের নাম বদলে হয় দ্যা রয়্যাল এয়ার ফোর্স। এর তিন দিন পর তাঁকে মরণোত্তর ‘দ্যা ডিসটিনগুইশড ফ্লায়িং ক্রস’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। সেদিনের এই বৈমানিক ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ওই সম্মান পেয়েছিলেন।

আরো পরুনঃ  মহাষষ্ঠী ও মহাসপ্তমীর দিনে পড়ল UGC NET পরীক্ষা - প্রতিবাদে সরব ঐক্য বাংলা

উত্তর ফ্রান্সের এসতেভেলেস কমিউনাল সেমেটারির ওপর লেখা …..’তিনি মারা গিয়েছেন তাঁর আদর্শকে ভালোবেসে’। সমাধির তলায় যিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন তাঁর জন্ম ফ্রান্স থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে কলকাতায়! একুশ বছরের এক বঙ্গসন্তান যিনি প্রথম ভারতীয় যুদ্ধ বিমানচালক ল্যাডি ওরফে ইন্দ্রলাল রায়। তাঁর দিদি লীলার ছেলে সুব্রত মুখোপাধ্যায় স্বাধীনতার পরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রথম ‘চিফ ওফ দি এয়ার স্টাফ’ হয়েছিলেন। বেঁচে থাকলে ভাগ্নের জন্য মামা নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন।

বাংলার মুখঃ স্বাধীনতা সংগ্রা্মী “সুরেশ দে” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শ্রীলেদার্স”

দক্ষিণ কলকাতার ইন্দিরা সিনেমাহলের কাছে একটি রাস্তার নাম ‘ইন্দ্র রায় সরণী’। কিন্তু আমরা কজনই বা চিনি এই বীর বাঙালিকে। বাঙালির ভীতু , ঘরকুনো তকমাটা যিনি মুছতে চেয়েছিলেন , মৃত্যুর একশো বছর পরেও সেই ল্যাডি ওরফে ইন্দ্রলাল রায়ের নামে একটা রাস্তার নামকরণ ছাড়া আমরা আর কোনো সম্মানই দেখাইনি। “

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : স্বপন সেন

- Advertisement -

আরো প্রতিবেদন

একটি মতামত জানান

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisement -

সদ্য প্রকাশিতঃ