বিশ্বকবির অন্তিম সময় ও জনতা – অনিকেত চৌধুরী

0
117
বিশ্বকবির অন্তিম সময় ও জনতা – অনিকেত চৌধুরী

মৃত্যুর আগে রবীন্দ্রনাথ নির্মলকুমারী মহালানাবিশকে লিখেছিলেন,  “তুমি যদি আমার সত্যি বন্ধু হও,তাহলে দেখো আমার যেনো কলকাতার উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে ‘জয় বিশ্বকবি কি জয়;  জয় রবীন্দ্রনাথের জয়; বন্দেমাতরম ‘_ এইরকম জয়ধ্বনীর মধ্যে সমাপ্তি না ঘটে

আমি যেতে চাই শান্তিনিকেতনের উদার মাঠের মধ্যে উন্মুক্ত আকাশের তলায়, আমার ছেলে মেয়েদের মাঝখানে। সেখানে জয়ধ্বনী থাকবে না,  উন্মত্ততা থাকবে না।থাকবে শান্ত স্তব্ধ প্রকৃতির সমাবেশ।    প্রকৃতিতে মানুষে মিলে দেবে আমাকে শান্তির পাথেও।    আমার দেহ শান্তিনিকেতনের মাটিতে মিশিয়ে যাবে _এই আমার আকাঙ্ক্ষা।চিরকাল জপ করেছি,  “শান্তম “। এখান থেকে বিদায় নেবার আগে যেনো সেই “শান্তম ” মন্ত্রই সার্থক হয়।    কলকাতার উন্মত্ত কোলাহল,  জয়ধ্বনির কথা মনে করলে আমার মরতে ইচ্ছে করে না। তোমাকে সব বলে রাখলুম আগে থেকে।”

আরো পড়ুনঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু আবেগ নয়, বাঁচার লড়াই

কিন্তু হায় সেই কবিকেই মৃত্যুর আগে টেনে আনা হলো কলকাতায়।    বিবেকহীন,  চেতনাহীন মাংসপিন্ড ন্যায় জনতার মাঝে। যেখানে শুধুই উদগ্র, অশ্লীল আবেগ।    যেদিন কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন সেই দিন কি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল এই জনতা,  আর তার কৌতুহল এবং পূণ্য অর্জনের বাসনা,  সেই বর্ণনা পাই নির্মালকুমারি দেবীর লেখা থেকে;  “জোড়াসাঁকোর আঙিনাতে নেবে দেখি জনসমুদ্র পার হয়ে উপরে যাওয়া অসম্ভব।     ওবাড়ির অন্যান্য অংশ ও চিনি বলে অন্য রাস্তাতে সহজেই উপরে উঠতে পারলাম।ঘরের ভিতরে পৌঁছবার কয়েক সেকেন্ড আগেই শেষ নিঃশ্বাস থেমে গেছে।ভাগ্যের একি নিদারুণ চক্রান্ত। তাঁর কাছে যে সত্য করেছিলাম তা পালন করতে পারলাম না।আমার কথার উপরে তাঁর খুব বিশ্বাস ছিল,সেই জন্য এটা বার বার খোঁচা দিচ্ছে।

আরো পরুনঃ  আগস্ট ২০২০ তে ৩০ লাখ না এক কোটী? ভারতে সংক্রমণ কত হবে? কোভিড ১৯ এর ভারত যাত্রা!

আরো পড়ুনঃ মানুষ হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না প্রমাণ করেছেন আলপনা মন্ডল।

আজ কোথায় গেলো তাঁর বিশ্বাস ?অমিতা আমাকে বললো,  আর একটু আগে এসেও যদি আপনি পৌঁছাতে পারতেন।    ঠিক শেষ মুহূর্তের আগে ডান হাতখানা কাঁপতে কাঁপতে উপরে তুলে কপালে ঠেকাতেই হাত পড়ে গেলো।   একটু পরেই সেবক সেবিকা ছাড়া সবাইকে ঘর থেকে ছেড়ে চলে যেতে বলা হলো।গুরুদেবকে স্নান করানো,  সাজিয়ে দেবার কাজ এখনও যে বাকি আছে। মেয়েদের মধ্যে ঘরে শুধু আমি,  বুড়ি আর অমিতা; আর ছেলেদের মধ্যে সুরেন বাবু,  বিশু এবং আরও অনেকে।

যখন স্নান করানো হচ্ছে,  নিচের জনতার মধ্যে একদল উপরে এসে বাইরে থেকে টান মেরে দরজার ছিটকিনি খুলে ঘরে ঢুকে পড়লো।কী দারুণ অপমান কবির চৈতন্যাহারা এই দেহটার।    যে মানুষের মন এত স্পর্শকাতর ছিল, যে মানুষটা বাইরের লোকের সামনে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা কখনো প্রকাশ করতে পারতেন না, সেই মানুষের আত্মাহীন দেহখানা অসহায় ভাবে জনতার কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে পড়ে রইলো।”

আরো পড়ুনঃ বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার?

আরো পরুনঃ  কাকোরী ট্রেন লুন্ঠনের ৯৫ তম বর্ষ - বেঙ্গল ডিফেন্স

এই হলো জনতা। আমাদের সর্বশক্তিমান পাবলিক। আহা কি আনন্দ এই জনতা হয়ে ওঠার।জীবনের সকল হতাশা মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশ।তাইতো সকাল বিকাল নিয়ম করে অফিস যাওয়া আসার সময় আমরা জনতা হবার মজা লুটি। জনতা হবার সব থেকে বড় মজা হলো,   জনতার কোনো responsibility নেই,কিন্তু ক্ষমতা আছে। জনতার কোনো মুখ নেই। সে faceless,   identity less .. কিন্তু এখানে আছে মজা মারার অসীম সুযোগ।যা খুশি বলা যায়,যা খুশি করা যায়। পিটিয়ে মেরেও ফেলা যায়।কিন্তু কখনোই ধরা পড়ার ভয় নেই।
এই জনতাই সেদিন কবির মরদেহকে ছিনিয়ে নিলো মাঝ রাস্তা থেকে।হামলে পড়লো সেই সৌম্যকান্তি দেব- পুরুষটির উপরে।উন্মত্ত জনতার টানা হাঁচড়ার মধ্যেই শবযাত্রা চলতে লাগলো নিমতলা ঘাটের দিকে। ব্রিটিশ পুলিশেরও সাধ্য হলনা এই জনতাকে আটকানোর।

আরো পড়ুনঃ ১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল স্বদেশী ‘মার্গো’ সাবানের জয়যাত্রা , নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি

“জয় রবীন্দ্রনাথের জয়”,” জয় বিশ্বকবির জয়”,”বন্দেমাতরম” ইত্যাদি নানা ধ্বনিতে কলকাতার আকাশ তখন কেঁপে কেঁপে উঠছে।আর আমাদের প্রিয় কবির দেহ তখন ধর্ষিত হচ্ছে সেই সর্বশক্তিমান জনতার হাতে।প্রথমে টেনে খুলে নিলো তাঁর গলার মালা।কেউ খুলে নিলো তাঁর উত্তরীয়।তারপর এক এক করে টেনে ছিড়ে নিলো প্রতিটা চুল।খুবলে নিলো শ্বেতশুভ্র দাঁড়ি। কবিপূত্র রথীন্দ্রনাথের একান্ত সনির্বন্ধ অনুরোধে যখন কবির দেহ ফেরত পাওয়া গেলো তখন সেই বিকৃত মুখ দেখলে শিউরে উঠতে হয়। সেই দেহকেই কোনরকমে চিতায় তোলা হলো।    কিন্তু কিছু সময়ের পরেই সেই জ্বলন্ত চিতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো জনতার ঢেউ।   অর্ধদগ্ধ মরদেহকে নিয়ে শুরু হলো শিয়াল কুকুরের মতো টানাটানি। কবি বলেছিলেন “মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।” ধন্য কবি তোমার দূরদৃষ্টি।

আরো পরুনঃ  পথ দেখালো বাংলা - প্রথম বৃহন্নলা বিচারপতি "জয়িতা মন্ডল"

আরো পড়ুনঃ স্বাধীনতা সংগ্রামী “সুরেশ দে” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শ্রীলেদার্স”

জনতা,  জনতা। মুন্ডুহীন,  অন্ধ,  বধির জনতা। তীব্র তার গলার আওয়াজ। কর্কশ তার চিৎকার।    কৌতুহল,  কৌতুহল; শুধুই নিচ, অশ্লীল কৌতুহল। কোনো রকম পরিশ্রম না করে সস্তায় অমৃত লাভের ভয়ঙ্কর বাসনা। জনতার কোনো লজিক নেই, এটা ভাবলেও চলবে না। এই জনতাই বলে,  “রবিন্দনাথ কি বিশ্বভারতীর বাবার সম্পত্তি ? “ক্রিকেট খেলায় পাকিস্থান ভারতের কাছে হেরে গেলে এরাই অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে বলে,  “ভাই ঢুক্কিয়ে দিয়েছি।”ভিড় ট্রেনের মধ্যেই এরাই চিৎকার করে ওঠে,  “জিওকাকা।”

শপিং মল থেকে শান্তিনিকতন, বইমেলা থেকে বড়বাজার,এই জনতার ভিড়। যুগে যুগে এরাই কখনো কাউকে অবতার বানিয়েছে,  আবার কাউকে শয়তান বলে পুড়িয়ে মেরেছে। এই সর্বশক্তিমান জনতার সামনে খুবই অসহায় বোধ হয়। মুখ বুজে থাকার চেষ্টা করি। তবু কানে আসে তাদের গগণভেদী রনোধ্বনী।    যাক সেসব কথা।পথে ঘাটে আমিওতো জনতা। আমাদের চৈতন্য হোক। জয় জনতার জয়।।
(Aniket Chowdhury 21/01/2020)