পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

1
546
পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়
- বিজ্ঞাপন -

বাঙালির দুর্গা উপাসনার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে আমরা সরাসরি পালযুগে পৌঁছে যাই, পালযুগের বিভিন্ন মাতৃকামূর্তি নিয়ে পেজ থেকে আগে একটা পোস্ট করেছি। যদিও অন্য অর্থে গঙ্গাল সভ্যতার দশায়ুধা মূর্তি, যাঁর সঙ্গে চারজন সহচর, সেটিকেই আজকের সন্তানসহ দুর্গাপ্রতিমার আদি রূপ বলে ভাবা যেতে পারে।

- বিজ্ঞাপন -

আজ যে মূর্তিটি দেখছেন, সেটি সেনযুগের ভাবা হয়। সেনযুগে বিশেষ করে বল্লালসেনের শাক্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু, এটা সেক্ষেত্রে বল্লালসেন-রাজত্বকালের সময়কার হতে পারে।

সপ্তম শতকের দেবীপুরাণ বলছে যে রাঢ় বরেন্দ্র কামরূপে বামাচারী শাক্তমতে মাতৃকা উপাসনা হত। এই সময় সম্ভবত মাৎস্যন্যায় শুরু হয়ে গেছে এবং বাঙালির আবহমানকালের মাতৃকা-উপাসকরা গুহ্য তান্ত্রিক সাধনায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি এর আগে একাধিকবার বলেছি যে আর্যাবর্তের আগ্রাসনের প্রত্যুত্তরে আমাদের মাতৃকারা উগ্ররূপ, যোদ্ধারূপ ধারণ করেছিলেন।

আরো পড়ুনঃ বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার?

পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সম্ভবত অবচেতনে চন্দ্রকেতুগড়ের গঙ্গাল সভ্যতার স্মৃতি আছে।

কিন্তু আজ এই যে মূর্তির চিত্র দেখছেন, ইনি দশভুজা নন। এঁর ষোলোটি হাত।

আরো পরুনঃ  মধ্যযুগের সাত টি ফেক নিউজ - ডাঃ তমাল দাশগুপ্ত

ভবিষ্যপুরাণে যে নবদুর্গা মূর্তির কথা বলা হয়েছে, দিনাজপুরে সেরকম নবদুর্গা পাওয়া গেছে বলে জানাচ্ছেন নীহাররঞ্জন। এই নবদুর্গা মূর্তিসমূহের মধ্যস্থলে একটি অষ্টাদশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা। এবং চারপাশে আটটি অনুরূপ মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি, যাদের প্রত্যেকের ষোলোটি হাত।

আরো পড়ুনঃ মধ্যযুগের সাতটি ফেক নিউজ

সেরকমই একটি মূর্তি দেখছেন এখানে। মায়ের পদদ্বয় প্রত্যালীঢ় ভঙ্গিতে (জিতেন্দ্র নাথ ব্যানার্জিকে অনুসরণ করে, তাঁর একটি চমৎকার আলোচনা আছে পাল সেন যুগের মূর্তি নিয়ে, রমেশ মজুমদার সম্পাদিত হিস্ট্রি অভ বেঙ্গল হিন্দু পিরিয়ড গ্রন্থে), – ডান পা সিংহের ওপর, আর বাঁ পা মহিষের ওপর। একটি পা প্রসারিত, একটি সংকুচিত। যুদ্ধকালে শরসন্ধান করার সময়ে এমনভাবেই পদদ্বয় থাকার নিয়ম। মা চিরকাল এভাবেই বাঙালির ঘরশত্রু ও বহিঃশত্রুদের বিনাশ করুন।

আমি পুরোহিত দর্পণে দেখছি যে বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণে দুর্গাপুজোর বর্ণনায় মূল দুর্গামূর্তিকে (নীহাররঞ্জন এই নবদুর্গার মধ্যিখানে থাকা আঠেরো হাতবিশিষ্ট মূর্তিটিকে উগ্রচণ্ডী বলেছেন, আসলে ভবিষ্যপুরাণে উগ্রচণ্ডা আছে। যেমন রাজবৃত্ত অত্যন্ত দুর্বল তেমনই বাঙালির ধর্ম অংশটিও নীহাররঞ্জনে অত্যন্ত দায়সারা ) ঘিরে থাকা এই অষ্টশক্তির নাম এভাবে দেওয়া হয়েছেঃ উগ্রচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্রা, চণ্ডনায়িকা, চণ্ডা, চণ্ডবতী, চণ্ডরূপা, অতিচণ্ডিকা। কিন্তু ভবিষ্যপুরাণে অষ্টশক্তির প্রথমজনকে রুদ্রচণ্ডা বলা আছে, এবং সেটাই ঠিক।

আরো পরুনঃ  বীরভূম হিংসা | তৃণমূল নেতা খুনের সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট


বীরভূমের বক্রেশ্বরেও ষোলো হাতযুক্ত মহিষাসুরমর্দিনীমূর্তি পাওয়া গেছে, নীহাররঞ্জন জানাচ্ছেন। এই নবদুর্গা পরিকল্পনায় মহাযানী বজ্রযানী প্রতিমা বিন্যাসের প্রভাব ছিল।

কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল ও আছে ইতিহাসের ইঙ্গিতঃ আমাদের মাতৃকা যুগে যুগে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছেন, সেই দীর্ঘ ইতিহাস যেন প্রতীকীভাবে হলেও বাঙালি জাতি সদা সর্বদা স্মরণে রাখে।

© তমাল দাশগুপ্ত

ষোড়শভুজা মহিষাসুরমর্দিনী। দ্বাদশ শতক, সেনযুগ। পাথরের মূর্তি (আর্জিলাইট)। মূর্তিটির বর্তমান স্থান মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অভ আর্ট, নিউ ইয়র্ক।

- বিজ্ঞাপন -

১ টি মন্তব্য