Sunday, June 13, 2021

বাঙালি জাতির প্রাচীনতম সম্রাট – পৌণ্ড্রক বাসুদেব – ডাঃ তমাল দাশগুপ্ত

অবশ্যই পরুনঃ

বাঙালি জাতির প্রাচীনতম সম্রাট। তাঁকে নিয়ে এর আগে একাধিকবার লিখেছি। সেগুলো একত্রে সঙ্কলন করে, আজ, জন্মাষ্টমীর দিনে, পৌণ্ড্রক বাসুদেবের কাহিনী…

এই যুদ্ধবিদীর্ণ প্রাচীন জাতির মুখমণ্ডলে নেমে আসা পরাজয়-অপমানের প্রত্যেক ছায়ার দিব্যি থাকুক, আমাদের ইতিহাস সাক্ষী থাকুক, আমাদের প্রত্যেক পরাজয় থেকে বারবার আমাদের পুনরুত্থান ঘটেছে। সেভাবে আজ পৌণ্ড্রক বাসুদেবের পুনরুজ্জীবন ঘটুক বাঙালির স্মৃতিতে।

পুণ্ড্র প্রাচীন জনপদ। পূর্ব ভারতে এই জনপদটির আদি ভাষা কি দ্রাবিড়জাতীয় ছিল? কারণ রামায়ণে দেখা যায় সুগ্রীব মৎস্য কলিঙ্গ পুণ্ড্র কেরল প্রভৃতি দেশে সীতার অনুসন্ধান করতে সার্চ টিম পাঠিয়েছিলেন।

আরো পড়ুনঃ পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

পুণ্ড্রের পরেই কেরলের উল্লেখ বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ শ্লোক মনে করিয়ে দেয়। চের বা কেরল একটি দ্রাবিড় জাতি, বর্তমানে এরাই কেরালার বাসিন্দা। পূর্ব ভারতে বলির পাঁচ পুত্রের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই পাঁচটি জনপদের উত্থান ঘটেছিল, উৎসকালে তাদের ভাষা সম্ভবত দ্রাবিড় ছিল, আমার মনে হয়।

সেজন্য পুণ্ড্রের উৎস বাঙালি জাতির উত্থানেরও আগেকার কথা বলে মনে হয়। বাঙালির ভাষাটা ব্রাত্য আর্যদের ভাষা, দ্রাবিড় নয়, যদিও বাংলা ভাষায় দ্রাবিড় উপাদান প্রচুর।

পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত (দামল বা তামল জাতির রাজ্য) ইত্যাদি প্রাচীন দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে ব্রাত্য আর্যদের মিশ্রণ ঘটে গেছে, অস্ট্রিক মিশেছে, এবং পূর্ব ভারতে হিমালয় সীমান্ত থেকে মোঙ্গলয়েড রক্তপ্রবাহ – এইভাবে ঐতিহাসিককালে বাঙালি জাতির উত্থান ঘটেছিল। এবং এই উত্থানে মুখ্য ভূমিকা নেয় প্রকৃতিমাতৃকা উপাসনার ধর্ম।

আরো পড়ুনঃ মধ্যযুগের সাতটি ফেক নিউজ

পৌণ্ড্র বাসুদেবের উত্থান এই ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির নেতা হিসেবেই, আমরা দেখব। মহাভারত যুদ্ধের সমকালীন অথবা তার কিছু পরে।

আরো পরুনঃ  বন্দেমাতরম! ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তর অবিচারে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও: ইতি - বিমল গুপ্ত

পুণ্ড্র জাতি এবং পৌণ্ড্রক বাসুদেবের স্মৃতি বাঙালির পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে ধরা আছে অনেকে মনে করেন। পাণ্ডুর রাজার ঢিবির উন্নত সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে ছিল মাতৃকা-উপাসক মিথ, সেটা প্রত্নপ্রমাণ থেকে বোঝা যায়। মালদা/হুগলির পাণ্ডুয়া নামটা পৌণ্ড্রক থেকে এসেছে, এমন হওয়া অসম্ভব নয়।

এই বাসুদেব কথাটা আজ বসুদেবের পুত্র অর্থে ব্যবহৃত হয়। পৌণ্ড্রক বাসুদেবকে বসুদেবের পুত্রই বলা হয়েছে, বসুদেবের দাসী সুতনুর গর্ভে পৌণ্ড্র বাসুদেবের জন্ম, হরিবংশ অনুযায়ী। যাঁরা এই পেজ ফলো করেন তাঁদের মনে থাকবে যে আমি একাধিকবার অভিযোগ করেছি যে কোনও ভারতীয় পুরাণ প্রবল পরাক্রান্ত পুণ্ড্ররাজ্যের রাজবংশের কোনও বর্ণনা দেয় না। পুণ্ড্র সেন্সর্ড। অথচ আর্যাবর্তের তুচ্ছাতিতুচ্ছ রাজবংশেরও বর্ণনা পাবেন পুরাণে।

আরো পরুনঃ  দেউল - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-২

আরো পড়ুনঃ বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার?

তাঁর বংশধারা কি ছিল? তিনি বসুদেবের পুত্র, তাই বাসুদেব, এরকম বলেছে। এবং তিনি বাসুদেবের চিহ্ন ধারণ করতেন। তিনি নাকি কাশী থেকে বিতাড়িত হয়ে পূর্বদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, এবং তাঁর সঙ্গে দুবার যুদ্ধ ঘটেছে মহাভারতের নায়কদের। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের আগে তিনি দিগ্বিজয়ী ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন।

পৌণ্ড্র বাসুদেব একমাত্র প্রাচীন পৌণ্ড্ররাজ যাঁর উল্লেখ করে আর্যাবর্ত, তবে তাঁর রাজত্বস্থান নিয়ে নানা পরস্পরবিরোধী মতঃ করুষ, বারাণসী, পুণ্ড্র – তিনরকমই শোনা যাচ্ছে।

তিনি অবশ্যই পুণ্ড্রের রাজা। তাঁকে প্রাগজ্যোতিষরাজ নরকের বন্ধু বলা হয়েছে। ভীমের সঙ্গে পূর্বদেশের রাজাদেরই যুদ্ধ হয়েছিল। ভীমের সঙ্গে তাম্রলিপ্ত, কর্বট, সুহ্ম ও বঙ্গের যুদ্ধ ঘটেছিল। কোনও সন্দেহ নেই, এই পৌণ্ড্রক বাসুদেব বাঙালি, তিনি পুণ্ড্রের রাজা।

আরো পড়ুনঃ ভারতীয় রাজনীতির আঙ্গিনায় ক্রিমিনাল দের অধিপত্য

রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলছেন, পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে বঙ্গ, পুণ্ড্র ও কিরাতদেশকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী যুক্তরাজ্য গঠনসাফল্যর প্রথম শিরোপা পাবেন পৌণ্ড্র বাসুদেব। তিনি বাঙালি জাতির সামরিক শক্তির স্ফুরণ, তিনি বাঙালি মহাজাতির উৎসে আছেন।

তবে বসুদেবের দাসীপুত্র কিভাবে হলেন?

এ প্রশ্নটা আলঙ্কারিক। তিনি বসুদেবের দাসীপুত্র নন, হতে পারেন না। তিনি বসুদেবের সন্তান বলে বাসুদেব, এরকম হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।

এখানে বলতে চাই, বৈষ্ণবভাগবততন্ত্রের ধারায় মহাভারত-পূর্ব যুগে একটি আর্যভাষী ট্রাইবের যোদ্ধা-নেতা নারায়ণ (পাঞ্চরাত্র সাধনা করেছিলেন ইনি) প্রবর্তিত একটি কাল্ট মহাভারত যুদ্ধের সমকালে শক্তিশালী হয়েছিল। এই কাল্টের নেতৃত্বপদ ছিল বাসুদেব।

বিশদ জানতে পড়ুনঃ কৃষ্ণচরিত্রের ক্রমবিবর্তন

অর্থাৎ বাসুদেব সর্বোচ্চ নেতৃত্বর উপাধি, যেমন আজ ক্যাথলিকদের পোপ।

পৌণ্ড্রক বাসুদেব এই সর্বভারতীয় কাল্ট-নেতৃত্ব গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, সেজন্য তিনি বাসুদেবের চিহ্ন গ্রহণ করতেন, ফলে সঙ্ঘর্ষ ঘটে। অর্থাৎ এই সঙ্ঘর্ষটি হয়েছিল কারণ পৌণ্ড্র বাসুদেব সাম্রাজ্যবিস্তার করতে চাইছিলেন।

আরো পরুনঃ  যতদিন দেশের একটি কুকুরও অভুক্ত থাকবে, ততদিন আমার মুক্তি নেই - স্বামিজী
আরো পরুনঃ  দেউল - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-২

প্রাচীনতম যুগে, মহাভারতের যুদ্ধের সময়ে বর্ধমানের পাণ্ডু রাজার ঢিবি অঞ্চলে দুটি বড় দুর্গ দেখা যায়, উন্নত সভ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়, একটি যুদ্ধ এবং যুদ্ধের পরে বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রমাণও মেলে। এবং এই সময়ে পাণ্ডু রাজার ঢিবি অঞ্চল সম্ভবত পুণ্ড্র রাজ্যের অন্তর্গত। যদিও পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে যা উৎখনন হয়েছে তা থেকে কোনও রাজার নাম জানা যায় না।

আরো পড়ুনঃ সাইকেলে চেপে দুধ বিক্রী থেকে শুরু করে আজ “রেড কাউ ডেয়ারি’

মহাভারতে প্রথম পৌণ্ড্র বাসুদেবের উল্লেখ পাই। মহাভারতের যুগে অর্থাৎ আনুমানিক ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে পুণ্ড্ররাজ্যের রাজধানী কোথায় জানা যায় না। কিন্তু মৌর্যযুগে অশোকের সময়ে পুণ্ড্রনগর (পুণদনগল) ছিল মহাস্থানগড় অঞ্চলে, অধুনা বাংলাদেশের বগুড়ায়। গৌড়বঙ্গে প্রাচীনতম লিপির নমুনা এই মহাস্থানগড় অঞ্চলের মৌর্য শিলালিপি।

পৌণ্ড্র বাসুদেবের সঙ্গে প্রাগ্‌জ্যোতিষরাজ নরক এবং মগধরাজ জরাসন্ধের মিত্রতা ছিল। তিনি বাসুদেবের চিহ্ন ধারণ করতেন। বাসুদেব নারায়ণ-উপাসক যে তান্ত্রিক বিষ্ণুভাগবত ধর্ম প্রচলিত হয়েছিল, তার নেতৃত্বশিরোপা ছিল। অর্থাৎ আদিতে এটি উপাধি। বসুদেবের পুত্র অর্থে বাসুদেব পরবর্তী পৌরাণিক যুগের সৃষ্টি। হরিবংশে লেখা হয়েছে যে পৌণ্ড্র বাসুদেবও বসুদেবের পুত্র, দাসী সুতনুর গর্ভে, এজন্য বাসুদেব। এটি পরবর্তীকালে বানানো কাহিনী বলেই মনে হয়েছে, কারণ একে তো মহাভারতে এমন কিছু বলা নেই, উপরন্তু উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে কিভাবে বগুড়া বা বর্ধমানে রাজা হলেন তার কোনও হদিস পাচ্ছি না।

আরো পড়ুনঃ ১০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল স্বদেশী ‘মার্গো’ সাবানের জয়যাত্রা যার নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি খগেন্দ্র চন্দ্র দাস।

পৌণ্ড্রক বাসুদেব বারংবার মহাবল বলে উল্লিখিত হয়েছেন। তিনি গর্বভরে বলেছিলেনঃ “আমার নিশিত সুদর্শন, আমার সহস্রার মহাঘোর চক্র, আমার শার্ঙ্গনামক মহারবসম্পন্ন মহাধনু, কৌমদকীনামক আমার এই বৃহৎ গদা, কৃষ্ণের গর্ব খর্ব করতে সক্ষম। অতএব আমি ধনু, শঙ্খ, শার্ঙ্গ, খড়্গ, ও গদাধর হইয়া কৃষ্ণকে জয় করিব” (হরিবংশ)।

বৃষ্ণি বাসুদেব অর্থাৎ মহাভারতের কৃষ্ণের সঙ্গে পৌণ্ড্র বাসুদেবের যুদ্ধ হয়, বাসুদেব শিরোপা এবং শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম ধারণের অধিকার নিয়ে। পৌণ্ড্র বাসুদেব আট সহস্র রথ, দশ সহস্র হস্তী এবং বহুসংখ্যক পদাতিক নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন।

আরো পরুনঃ  পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

সময়কাল – বঙ্কিম মহাভারত যুদ্ধের সময়কাল ধার্য করেছেন ১৫৩০-১২৬৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে কোনও এক সময়।

আরো পড়ুনঃ স্বাধীনতা সংগ্রা্মী “সুরেশ দে” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শ্রীলেদার্স”

তবে আমি পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সময়কাল সম্পর্কে আর একটা কথা বলতে চাই। বাংলার প্রাচীনতম সভ্যতাস্মারক হল পাণ্ডু রাজার ঢিবি (এর আগে লিখেছি, এই পেজে স্ক্রোল ডাউন করলে পাবেন)। পাণ্ডু রাজার ঢিবির উন্নত নগরসভ্যতা ছিল হরপ্পা সভ্যতার অন্তিম পর্বের সমসাময়িক (৪০০০ বছর পুরোনো)। ক্রীট দ্বীপের সঙ্গে বাণিজ্য চলত এই পাণ্ডু রাজার ঢিবির বাসিন্দাদের। আনুমানিক ৩০০০ বছর আগে একটি ভীষণ অগ্নিকাণ্ডে সেটা ভস্মীভূত হয়।

আরো পরুনঃ  বাঙালির ইতিহাস - ডাঃ তমাল দাশগুপ্তর কলমে

ভস্মীভূত হওয়ার আগে সেখানকার প্রত্নস্তরে তামার অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের পরে যখন সেখানে আবার সভ্যতা গড়ে উঠল, এই স্তরের সভ্যতায় এবার থেকে লোহার অস্ত্র পাওয়া গেল।

পরেশ দাশগুপ্ত তাঁর প্রতিবেদনে এজন্য বলেন, যে একটি আক্রমণ ঘটেছিল, এবং পাণ্ডু রাজার ঢিবির বাসিন্দাদের পরাজিত হওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে তাঁরা তামার অস্ত্র ব্যবহার করতেন। লোহার ব্যবহার জানতেন না।

আরো পড়ুনঃ কাকোরী ট্রেন লুন্ঠনের ৯৫ তম বর্ষ – বেঙ্গল ডিফেন্স

এই মাতৃকাউপাসক, তন্ত্রধর্মীয় জাতির নেতা কি পৌণ্ড্রক? এই পৌণ্ড্রক বাসুদেবের পরাজয়ের সঙ্গে পাণ্ডু রাজার ঢিবির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে সংযুক্ত করা যায়? আমরা জানি না। তবে বৃষ্ণি বাসুদেব (মহাভারতের কৃষ্ণ) একবার বারাণসী পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটা মহাভারত অনুসরণ করে আমরা জানি, বঙ্কিমও কৃষ্ণচরিত্রে উল্লেখ করেছেন।

পর্যবেক্ষণঃ পৌণ্ড্রক বাসুদেবের পতনের কারণ কি তাহলে এই যে অনাধুনিক তামার অস্ত্র নিয়ে লৌহধাতুর অস্ত্রধারী বৃষ্ণি বাসুদেবের সঙ্গে তিনি এঁটে উঠতে পারেন নি? খুব সম্ভবত।

সিদ্ধান্তঃ পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সমাপ্তি থেকে বাঙালি শিক্ষা নিয়েছিল। পাণ্ডু রাজার ঢিবি পুড়ে যাওয়ার পাঁচশো বছরের মধ্যে প্রবল পরাক্রান্ত গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্য মাথা তুলবে।

© তমাল দাশগুপ্ত

- Advertisement -

আরো প্রতিবেদন

একটি মতামত জানান

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisement -

সদ্য প্রকাশিতঃ