Sunday, June 13, 2021

বন্দেমাতরম! ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তর অবিচারে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও: ইতি – বিমল গুপ্ত

এক লাফে গার্লিকের টেবিলে, এর চেয়ে ঢের লম্বা লাফ সে হেসেখেলে দিয়ে থাকে ব্যায়ামের আখড়ায়। মাত্র কয়েক হাতের দূরত্ব থেকে সোজা গার্লিকের কপাল লক্ষ্য করে গুলি। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরপর দুটো। লক্ষ্যভেদ, এজলাসেই সম্পন্ন গার্লিক-নিধন।

অবশ্যই পরুনঃ

রণসাজ সম্পূর্ণ। নেহাতই গোবেচারা গ্রাম্য যুবকের বেশ। এলোমেলো চুল, কোঁচা-দোলানো হেঁটো ধুতি আধময়লা। গলা-আঁটা অপরিষ্কার শার্ট। তার উপর কোট। পায়ে নতুন সাদা ক্যাম্বিসের জুতো। হাতে ছাতা, যার মধ্যে গুলিভরা 380 bore-এর আগ্নেয়াস্ত্র। বেলা বারোটা নাগাদ আলিপুরগামী ট্রামে উঠে বসলেন তিনি। আজ যে তাঁকে গার্লিককে হত্যা করে বদলা নিতেই হবে | সেই গার্লিক, যিনি দীনেশ গুপ্তের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। যিনি বিচারাধীন বিপ্লবীদের প্রতি বরাবরই ছিলেন খড়গহস্ত, রাজদ্রোহের যে কোন মামলায় অভিযুক্তের প্রতি ছিলেন মাত্রাছাড়া নির্মম !

আরো পড়ুনঃ কাকোরী ট্রেন লুন্ঠনের ৯৫ তম বর্ষ

আরো পরুনঃ  দেউল - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-২

এজলাসে গার্লিক সাহেব নেই, লাঞ্চে গেছেন। একটু পরেই আসবেন। তিনি সুবোধ বালকের মতো বসে আছে আমজনতার ভিড়ে। সাজ এত নিখুঁত হয়েছে, সন্দেহ করার কোন কারণ খুঁজে পায়নি এজলাসের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো সার্জেন্ট। কাঁটায় কাঁটায় দুটোয় গার্লিক ফের এলেন এজলাসে। সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়াল সবাই। গার্লিক বসলেন, শুনানি শুরু হল।

– Me Lord… my humble submission before the Learned Court is that…

উকিলের সওয়াল শুনতে শুনতে যখন মাথা নিচু করে একমনে কিছু নোট করছেন গার্লিক, তিনি ঠিক করলেন, এই হল মাহেন্দ্রক্ষণ। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তে, এই লোকটা দীনেশ গুপ্তের প্রাণ নিয়েছে,কত বিপ্লবীকে বাধ্য করেছে কারাবাসে, একে খতম করার সুযোগ পাওয়াটাই তো পরম প্রাপ্তি। ক’জন পায়?

আরো পরুনঃ  কাকোরী ট্রেন লুন্ঠনের ৯৫ তম বর্ষ - বেঙ্গল ডিফেন্স

আরো পড়ুনঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু আবেগ নয়, বাঁচার লড়াই

কেউ কিছু বোঝার আগেই দ্রুত উঠে পড়েন, চকিত ক্ষিপ্রতায় পৌঁছে যান সাক্ষীর শূন্য কাঠগড়ায়। ঘরটা বিশেষ বড় নয়। সামান্যই দূরত্ব কাঠগড়া থেকে জজসাহেবের টেবিলের। সিলিং লক্ষ্য করে প্রথম গুলি… শব্দে সচকিত গার্লিক মুখ তুলতে না তুলতেই লাফ দিয়ে উঠলেন কাঠগড়ার রেলিংয়ের উপর। সেখান থেকে এক লাফে গার্লিকের টেবিলে, এর চেয়ে ঢের লম্বা লাফ সে হেসেখেলে দিয়ে থাকে ব্যায়ামের আখড়ায়। মাত্র কয়েক হাতের দূরত্ব থেকে সোজা গার্লিকের কপাল লক্ষ্য করে গুলি। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরপর দুটো। লক্ষ্যভেদ, এজলাসেই সম্পন্ন গার্লিক-নিধন।

আরো পড়ুনঃ বিশ্বে মাতৃভাষা আন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল নজির – ১৯৬১ এর ১৯শে মে – শিলচর ভাষা আন্দোলন

সাদা পোশাকের পুলিশ গুলি চালাল অভাবিত ঘটনার ঘোর কাটিয়ে। লক্ষ্যভ্রষ্ট। পাল্টা গুলি লাগল পুলিশের কাঁধে। সার্জেন্ট ততক্ষণে ছুটে এসেছেন আওয়াজ পেয়ে। গুলি চালিয়েছেন তাঁকে লক্ষ্য করে। লাগল পেটে আর পায়ে। ভূপতিত শরীরে আরো কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ অতঃপর এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। পটাশিয়াম সায়ানাইড ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি বীর বিপ্লবীর।

আরো পরুনঃ  বাঙালির ইতিহাস - ডাঃ তমাল দাশগুপ্তর কলমে
আরো পরুনঃ  গৌড় বনাম বাঙ্গালা এবং বাঙালি জাতির জন্ম ঃ মধ্যযুগ

আদালতে তুলকালাম তখন। প্রাণভয়ে লোকজন ছুটে বেরচ্ছে এজলাস থেকে। বহির্মুখী জনতার ঠেলাঠেলিতে উল্টে পড়েছে চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চ। কাগজপত্র লণ্ডভণ্ড। পাশের ঘর থেকে ফোন গিয়েছে লালবাজারে, সশস্ত্র বাহিনী প্রয়োজন। হাসপাতাল থেকে তলব করা হয়েছে অ্যাম্বুল্যান্স।

আরো পড়ুনঃ স্বাধীনতা সংগ্রামী “সুরেশ দে” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় শ্রীলেদার্স”

লালবাজারের কর্তারা ছুটে এলেন, মৃত বিপ্লবীর পকেট থেকে উদ্ধার হল সেই চিরকুট… “”বন্দেমাতরম! ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তর অবিচারে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও: ইতি – বিমল গুপ্ত”। কে এই বিমল গুপ্ত? পেডি-হত্যার ফেরারী আসামী বিমল দাশগুপ্ত? পেডি হত্যার পর বিমল দাশগুপ্ত তখন পুলিশের নাগালের বাইরে |

“কে”, জানতে চেষ্টার কসুর করেনি লালবাজার। ব্যর্থ হয়ে মরিয়া বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছিল কাগজে, “A reward is hereby declared, worth Rupees Five Hundred to be given to one who can identify the murderer of Mr. Garlick.” সাড়া মেলেনি বিজ্ঞাপনে। ঘটনার এক বছর তিন মাস পর মৃতদেহের ছবি দেখে চিহ্নিত করেছিলেন একজন। উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল বিপ্লবীদের। গার্লিক নিহত, অথচ পুলিশ চক্রীদের ধরবে কী, আততায়ীর পরিচয়ই তো জানা যায়নি দীর্ঘদিন। আর অপরদিকে বিমল দাশগুপ্তকেও পুলিশের নজর থেকে এড়ানো গেল কারণ অনেকের ধারণা ছিল মৃত বিপ্লবী ছিল বিমল দাশগুপ্ত, যা একেবারেই সত্যি নয় |

আরো পরুনঃ  কাশীপুরের রাজবাড়ি ও পঞ্চকোটের রাজবংশ - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-৩

আরো পড়ুনঃ বাণিজ্যনগরী কলকাতার স্রষ্টা কি বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ-বসাক পরিবার?

তিনি মাকে বলেছিলেন, বেশি দেরি হলে চিঠি লিখবেন। মা হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করেছিলেন চিঠির। চিঠি আসেনি। দুঃসংবাদ এসেছিল। আজ থেকে ৮৮ বছর‌ আগে ২৭ শে জুলাই কিন্তু বাঙালি কি তাঁকে মনে রেখেছে ? বাঙালি কি তাঁর আত্মত্যাগ সম্পর্কে ওয়াকিবহল? কতটা সাহস হলে কেউ ভরা এজলাসে গার্লিক হত্যা করতে পারে সেটা সত্যি ভাববার বিষয় |

দেশের জন্য হাসতে হাসতে জীবন বাজি রাখার আগে, তাঁর ছিল না অমরত্বের প্রত্যাশা, ছিল না ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়ার সুপ্ত বাসনা। সেই ১৯ বছরের যুবকটির নাম হল কানাইলাল ভট্টাচার্য | আজ তাঁর উদ্দেশ্যে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য | স্মৃতি তে সেই ভুলিয়ে দেওয়া ইতিহাস কে নিয়ে বেঁচে থাকবো আমরা ভারতবাসী….

আরো পরুনঃ  কাশীপুরের রাজবাড়ি ও পঞ্চকোটের রাজবংশ - দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-৩

Bengal Defence

- Advertisement -

আরো প্রতিবেদন

1 মন্তব্য

  1. দ্বিতীয় বল্লালসেন। কে ছিলেন কিংবদন্তীর দ্বিতীয় বল্লালসেন? | অল্ট বাংলা - বাঙালির শেকড়

    […] আরো পরুনঃ বন্দেমাতরম! ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তর অবি… […]

একটি মতামত জানান

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisement -

সদ্য প্রকাশিতঃ