Thursday, June 24, 2021

কাশীপুরের রাজবাড়ি ও পঞ্চকোটের রাজবংশ – দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-৩

১৮৩২ সালে হুড়ার কেশরগড় (রাজধানী ছিল ১৭৯৩ খ্রীঃ থেকে ১৮৩২ খ্রীঃ পর্যন্ত) থেকে রাজধানী দ্বারকেশ্বর নদের গাঁ ঘেষা কাশীপুরে তুলে নিয়ে আসেন পঞ্চকোট রাজ জগজীবন সিংহ দেও (গরুড় নারায়ণ)।

অবশ্যই পরুনঃ

সৌরভ দাশগুপ্তর পাতা থেকেঃ বিধানসভা নির্বাচনের কাজে নিয়মিত রঘুনাথপুর যাওয়ার জন্য কাশীপুর রাজবাড়ির পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে পঞ্চকোট রাজবংশের ইতিহাস আর রাজবাড়ির অন্দরমহল আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করতে শুরু করেছিল।

বই কিনে, নেট থেকে ডাউনলোড করে কিঞ্চিৎ পড়াশুনা করার ফাঁকে ফাঁকেই একদিন বিকেলবেলায় জুটে গেল পুরুলিয়ার সর্বপ্রাচীন রাজবংশ পঞ্চকোট রাজাদের কাশীপুরের রাজবাড়ি দেখার এক সুবর্ণ সুযোগ।

আরো পরুনঃ গৌড় বনাম বাঙ্গালা এবং বাঙালি জাতির জন্ম ঃ মধ্যযুগ

ভেবেছিলাম বাইরে থেকে শুধু রাজবাড়ির চেহারাটা দেখেই ফেরত আসতে হবে কেননা রাজবাড়িতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ দুর্গাপুজোর সময় ছাড়া একপ্রকার নিষিদ্ধই কিন্তু অসাধ্যসাধন করল আমার ড্রাইভার প্রদ্যুৎ। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম, ইতিমধ্যেই সে গিয়ে রাজবাড়ির দ্বাররক্ষীদের কাছে গিয়ে আমার সামান্য পরিচয়টুকু দিয়ে অনুরোধ করে ভেতরে ঢোকার পারমিশান যোগাড় করে ফেলেছে।

আরো পরুনঃ  গৌড় বনাম বাঙ্গালা এবং বাঙালি জাতির জন্ম ঃ মধ্যযুগ

যাইহোক দারোয়ানদের শুকনো কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে চাক্ষুস করা গেল সেই গৌরবজনক অধ্যায়ের যার খুব সামান্য অংশটুকুই নীচে লিখব। কাশীপুরের রাজবাড়ি নিয়ে দুলাইন লেখার আগে পঞ্চকোট রাজবংশের একটু পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন।

আরো পরুনঃ দ্বিতীয় বল্লালসেন। কে ছিলেন কিংবদন্তীর দ্বিতীয় বল্লালসেন?

আরো পরুনঃ  বাঙালির ইতিহাস - ডাঃ তমাল দাশগুপ্তর কলমে

পঞ্চকোট রাজবংশ মানভূম-পুরুলিয়ার প্রাচীন রাজবংশ। প্রায় ১,৯০০ বছর আগে ঝালদায় এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হয়। ঝালদা, পাড়া, গড়পঞ্চকোট, মহারাজনগর, রামবনি, কেশরগড় এবং সর্বশেষ কাশীপুর— এই সাতটি রাজধানী থেকে পঞ্চকোটের রাজারা এই এলাকা শাসন করতেন।

ইতিহাস আরো বলে মধ্যপ্রদেশের উজ্জ্বয়িনীর ‘ধারানগর’ স্টেট থেকে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা এসেছিলেন পুরুলিয়ায়। এই রাজবংশকে ‘শিখরভূম রাজবংশ’ও বলা হয়ে থাকে।

পঞ্চকোট রাজবংশের ইতিহাস বলছে, ১৮৩২ সালে হুড়ার কেশরগড় (রাজধানী ছিল ১৭৯৩ খ্রীঃ থেকে ১৮৩২ খ্রীঃ পর্যন্ত) থেকে রাজধানী দ্বারকেশ্বর নদের গাঁ ঘেষা কাশীপুরে তুলে নিয়ে আসেন পঞ্চকোট রাজ জগজীবন সিংহ দেও (গরুড় নারায়ণ)।

আরো পরুনঃ বাঙালির ইতিহাস – ডাঃ তমাল দাশগুপ্তর কলমে

এটি তাঁদের সপ্তম তথা শেষ রাজধানী। কাশীপুরে এই বংশের সাত রাজা জগজীবন, নীলমণি, হরিনারায়ণ, জ্যোতিপ্রসাদ, কল্যাণীপ্রসাদ, শঙ্করীপ্রসাদ ও ভুবনেশ্বরীপ্রসাদ রাজত্ব করেছিলেন। পুরুলিয়া জেলার প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক দিলীপ গোস্বামীর কথায়, “সাত জন রাজত্ব করলেও কাজকর্মের নিরিখে উপরের দিকে দুই রাজা নীলমণি ও জ্যোতিপ্রসাদের নাম উঠে আসে।

যদিও জগজীবন সিংদেও উন্মাদ রোগগ্রস্ত ছিলেন বলে তাঁর ভাই রামজীবণলাল কেশরগড়ে থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে নীলমণি সিংদেওর বালক বয়সেই জীবণ সংশয় দেখা দেয়। ফলে তাঁর মা মূলতঃ কাশীপুরে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

আরো পরুনঃ  বন্দেমাতরম! ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তর অবিচারে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও: ইতি - বিমল গুপ্ত
আরো পরুনঃ  পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

আরো পরুনঃ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরি হাসপাতাল ও বাঙালি বৈদ্য সমাজ সম্মানিত করল সমাজের বিভিন্ন কৃতি মহিলাদের

রাজ্যাভিষেক হওয়ার পরে নীলমণি সিংদেওর উপাধি হয় রঘুনাথনারায়ণ। এই নীলমণি সিংদেওর (১৮২৩-১৮৯৮ খ্রীঃ) সময়েই ধর্ম আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, জেলার বিভিন্ন জনপদ নির্মাণ, বিভিন্ন জাতির বসতি বিস্তারে আনুকূল্য দান, মন্দির-স্থাপত্য শিল্পের প্রসার, দেশপ্রেমিক প্রজাদের নিষ্কর মৌজা বিতরণ, ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং জনজাতিগুলির সঙ্গে রাজ পরিবারের আত্মিক সম্পর্ক পঞ্চকোট রাজ পরিবারটিকে সারা জেলা তথা রাজ্যের নিরীখে বিশিষ্টতা দিয়েছিল।

রাজা নীলমণির সেই ধারা পেয়েছিলেন নাতি রাজা জ্যোতিপ্রসাদও। মহারাজ জ‍্যোতিপ্রকাশ সিংহদেও ১৯১৬ সালে এই রাজবাড়ি (রাজবাড়িটির নাম জ্যোতিবিলাস) তৈরি করেন চিন থেকে রাজমিস্ত্রি এনে। টানা ১২ বছর ধরে চলেছিল নির্মাণ কাজ।

আরো পরুনঃ সারন্য র বসন্ত উৎসব নজরুল তীর্থে – দেওয়া হলো রবিরশ্মি আবৃতি পুরস্কার – রইল ভিডিও

কাশীপুরের পুরাতনগড় এলাকা থেকে সরে এসে রামবনি মৌজায় তিনি এই বাড়িটি তৈরি করেন। শৌখীনতা ছিল তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সুদূর বেলজিয়াম থেকে বিশাল ঝাড়লন্ঠন নিয়ে এসে লাগিয়েছিলেন প্রাসাদের দরবার হলে।বেলজিয়ামের পেন্টিং করা কাচ, পাথরের মূর্তি, গান বাজনার সরঞ্জাম দেখলে তাঁর রুচির পরিচয় পাওয়া যায়।

আরো পরুনঃ  পালযুগ থেকে দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি বাঙালির মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়

শুধু তাই নয় বিশাল জমাদার বাঁধের জল থেকে জলবিদ্যুৎ তৈরি করে প্রাসাদে আলোর ব্যবস্থা করেছিলেন জ্যোতিপ্রসাদ। ছিল নলবাহিত পানীয় জলের ব্যবস্থাও। তাঁর সময়েই তৎকালীন বিহার-ওড়িশার ছোটলাট এইচ এইচ বেইলি তাঁর ও সহধর্মিনী লেডি বেইলি কাশীপুরে আসেন। কাশীপুরে পঞ্চকোট রাজবংশের কুলদেবীর মন্দির দেবীবাড়িও তাঁরই তৈরি।

আরো পরুনঃ গান্ধী সেবা সঙ্ঘের সাহায্যার্থে সৃষ্টি ডান্স একাডেমি ও ইচ্ছে ডানা আয়োজিত শেষ বসন্ত উৎসবে একঝাঁক শিল্পী সমাগম।

এইবাড়িতেই (সঙ্গের ছবি দ্রষ্টব্য) রাজ পরিবারের বর্তমান বংশধররা থাকেন। শুধু পুজোর সময় রাজবাড়ির একাংশ (পিছনের দুর্গামণ্ডপ, ছবিতে দ্রষ্টব্য আর নীচের তলার দুটি ঘর) সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। রাজবাড়ির আজ ভগ্নদশা তবুও এখনো পুরুলিয়ায় ভ্রমণপিপাসুদের ভ্রমণতালিকায় প্রথমদিকেই রয়ে গেছে কাশীপুরের রাজবাড়ি।

আরো পরুনঃ  দ্বিতীয় বল্লালসেন। কে ছিলেন কিংবদন্তীর দ্বিতীয় বল্লালসেন?

ছবি ও লেখাঃ সৌরভ দাশগুপ্ত

- Advertisement -

আরো প্রতিবেদন

1 মন্তব্য

  1. দেউল – দ্বিতীয় দফার পুরুলিয়ার ডায়েরীঃ পর্ব-২ | অল্ট বাংলা - বাঙালির শেকড়

    […] আরো পড়ুনঃ কাশীপুরের রাজবাড়ি ও পঞ্চকোটের রাজবং… […]

একটি মতামত জানান

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisement -

সদ্য প্রকাশিতঃ